বাংলাদেশ ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়ক ও দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালকে ‘ভারতীয় দালাল’ হিসেবে অভিহিত করে এক নজিরবিহীন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বিসিবির পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। একজন বোর্ড কর্মকর্তার পক্ষ থেকে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়কের প্রতি এমন ‘Aggressive’ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জেরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গন। বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটাররা দলমত নির্বিশেষে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের যে ঝড় উঠেছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে বিসিবি ও ক্রিকেটারদের মধ্যকার সম্পর্কের গভীর ফাটলকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত: আইসিসি রেভিনিউ ও তামিমের গঠনমূলক যুক্তি
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি, ২০২৬)। ভারতের মাটিতে আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এক অনুষ্ঠানে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তামিম ইকবাল। সেখানে তিনি অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে ‘Policy Making’-এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের বার্ষিক অর্থের প্রায় ৯০-৯৯ শতাংশ আসে আইসিসি (ICC) থেকে। তাই যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি।” মূলত ‘ICC Revenue Share’ এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ স্বার্থ মাথায় রেখেই তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন।
তবে এই গঠনমূলক আলোচনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে বসেন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। তিনি ফেসবুকে তামিমের ছবি সম্বলিত একটি পোস্ট শেয়ার করে তাকে সরাসরি ‘ভারতীয় দালাল’ বলে আখ্যা দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “এইবার আরও একজন পরীক্ষিত ভারতীয় দালালের আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দুচোখ ভরে দেখলো।”
প্রতিবাদে সোচ্চার ক্রিকেটাররা: প্রশ্ন তুললেন পেশাদারিত্ব নিয়ে
নাজমুল ইসলামের এই ‘Unprofessional’ আচরণের পর আর চুপ থাকতে পারেননি জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। সাবেক ব্যাটার শামসুর রহমান শুভ প্রথম প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একজন বোর্ড ডিরেক্টর যখন প্রকাশ্য মঞ্চে এমন শব্দচয়ন করেন, তখন কর্মকর্তাদের ‘Code of Conduct’ বা আচরণবিধি নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। তিনি অবিলম্বে নাজমুল ইসলামের জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
টাইগার পেসার তাসকিন আহমেদ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “সাবেক অধিনায়ককে ঘিরে এ ধরনের বক্তব্য দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে সহায়ক নয়। আশা করি সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে।” পেস বোলিং অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনও তাসকিনের সুরে সুর মিলিয়ে বোর্ড কর্মকর্তার দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রুবেল হোসেনের বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া: ‘বেসিক সেন্স’ নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন সাবেক পেসার রুবেল হোসেন। তিনি নাজমুল ইসলামের পদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন, “একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে সম্মান দেওয়া তো দূরের কথা, আপনি তাকে দেশের মানুষের সামনে খারাপভাবে উপস্থাপন করলেন। এত বড় জায়গায় বসে কোথায় কী বলতে হয়, সেই ‘Basic Sense’ টুকু আপনার নেই। আপনি যদি কোনো ক্লাবের প্রতিনিধি মনে করেন নিজেকে, তবে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ‘This is Bangladesh Cricket Board’—এই চেয়ারের ওজন আপনার বোঝা উচিত।” রুবেল আরও প্রশ্ন তোলেন, কোন ‘Quota’ বা রাজনৈতিক প্রভাবে নাজমুল ইসলাম বিসিবির মতো সংস্থায় পরিচালক হয়েছেন।
অসহায়ত্ব প্রকাশ তাইজুল ও নাফিস ইকবালের
জাতীয় দলের অভিজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলাম এই মন্তব্যকে ‘রুচিহীন ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এমন আচরণ আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির পরিপন্থী। অন্যদিকে, তামিম ইকবালের বড় ভাই ও সাবেক ক্রিকেটার নাফিস ইকবাল খান সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টিকে ‘খুবই অপমানজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কোয়াবের আল্টিমেটাম ও বিসিবির নীরবতা
এই ঘটনার প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই বিসিবি সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠিয়েছে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (CWAB)। কোয়াবের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পরিচালককে দ্রুত প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, একজন ‘Stakeholder’ হিসেবে ক্রিকেটারদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। সেখানে বোর্ড পরিচালকের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে দেওয়া ‘Institutional Integrity’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সততার পরিপন্থী। এখন দেখার বিষয়, আইনি ও নৈতিক চাপের মুখে বিসিবি তাদের এই বিতর্কিত পরিচালকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে।