দেশের জ্বালানি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি (LPG) নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। সরকার কয়েক দফায় দাম সমন্বয় করলেও বাজারের লাগাম টানতে পুরোপুরি ব্যর্থ। বর্তমানে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৈরাজ্যের পেছনে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের এক বিশেষ ‘Nexus’ বা অসাধু যোগসাজশ কাজ করছে। অন্যদিকে, আমদানিকারকরা দুষছেন নীতিগত জটিলতাকে। সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ ‘Market Volatility’ বা বাজার অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে এলপিজি খাত।
সাড়ে ১২০০ টাকার গ্যাস ২৪০০ টাকায়: অসহায় ভোক্তা
বর্তমানে বাজারে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে সরকারিভাবে নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। গত ৪ জানুয়ারি (২০২৬) বিইআরসি নতুন করে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম আরও ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। খুচরা বাজারে এই অতিরিক্ত মূল্যের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত হানছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সাফ জানিয়েছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি সম্পূর্ণ কৃত্রিম এবং এটি একটি পরিকল্পিত ‘Market Manipulation’ বা কারসাজি।
ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট ও বিইআরসি-র ভূমিকা
দাম বাড়ানোর চাপ ও সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা নিয়ে মতবিরোধের জেরে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখে ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (BERC) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন। বিইআরসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এলপিজি কোম্পানিগুলোকে আগামী সপ্তাহে আলোচনায় ডাকা হবে এবং ‘Policy Support’ দিয়ে বাজার স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে।
সরবরাহ সংকট: ৩০টির মধ্যে ২৫টি কোম্পানিই ‘In-active’
ডিলারদের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে এই অস্থিরতার মূল কারণ তীব্র সরবরাহ সংকট। বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী ৩০টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ২৫টি কোম্পানির কাছেই পর্যাপ্ত গ্যাস নেই। এর ফলে বিশাল একটি ভোক্তা গোষ্ঠী গ্যাসের জন্য হাহাকার করছে। এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব (LOAB) দাবি করেছে, সরকার যদি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করে এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়, তবে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ পরিস্থিতি সহজ হতে পারে। লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসে আমদানিকৃত গ্যাস পৌঁছালে ‘Supply Chain’ আবার সচল হবে।
সরকার-ব্যবসায়ী যোগসাজশের অভিযোগ
বাজারে চলমান এই অরাজকতার জন্য সরাসরি সরকার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (CAB)। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি কাঠামোগত সমস্যা। তার মতে, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিতে জনগণকে জিম্মি করছে। এই ‘Corporate Monopoly’ বন্ধ না হলে কেবল দাম কমিয়ে বা বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সংকট নিরসনে ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ
পরিস্থিতি সামাল দিতে এলপিজি আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (NBR) এই সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, কর কমানোর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে আসবে এবং নতুন ‘Investment’ ত্বরান্বিত হবে।
ভবিষ্যৎ পথরেখা
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলপিজি বাজারের এই ‘Black Marketing’ এবং সিন্ডিকেট ভাঙা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা এবং ডিলার পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। ফেব্রুয়ারি নাগাদ গ্যাস সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি ব্যবসায়ীরা দিয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়ন হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।