ভোলার লালমোহনে নির্বাচনী গণসংযোগ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি, ২০২৬) রাতে উপজেলার রায়চাঁদ বাজারে এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২৩ জন আহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল মহড়া ও দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও বিবাদের নেপথ্য
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)-এর কয়েকজন নারী কর্মী রায়চাঁদ বাজার এলাকায় Election Campaign বা নির্বাচনী গণসংযোগে নামেন। তারা স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাড়িতে ভোট চাইতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে বিএনপির কয়েকজন কর্মী ওই নারী কর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন।
এই খবর ছড়িয়ে পড়লে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় কর্মী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের মোবাইল ফোনে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। যদিও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নিজামুল হক নাঈম এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবালসহ সিনিয়র নেতারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত করেছিলেন, কিন্তু সন্ধ্যার পর তা আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
রণক্ষেত্র রায়চাঁদ বাজার: পাল্টাপাল্টি হামলা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাগরিবের নামাজের পর রায়চাঁদ বাজার এলাকায় একটি মোটরসাইকেল মহড়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে উভয় পক্ষ লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই তণ্ডবে পুরো বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নিজামুল হক নাঈমের দাবি, "আমাদের সমর্থকরা শান্তভাবে চলে যাওয়ার সময় বিএনপির কর্মীরা পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে জামায়াত নেতা সোলাইমান জমদার ও আবু জাফরসহ আমাদের ১১ জন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।"
অন্যদিকে, লালমোহন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "জামায়াতের সহায়তায় বিডিপি কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট ক্যাডাররা আমাদের ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি জসিম মাস্টার ও ছাত্রদল নেতা আক্তার হোসেন নান্নুসহ ১২ জনের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে।"
আহতদের অবস্থা ও চিকিৎসাসেবা
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ১৫ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তবে মাথার আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে (General Hospital) স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালের Emergency Department থেকে জানানো হয়েছে, আহতদের অনেকের শরীরেই ইটপাটকেল ও ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতি
লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল ইসলাম জানান, "জুমার নামাজের আগে নারী কর্মীদের গণসংযোগ নিয়ে সৃষ্ট বিবাদ থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে সন্ধ্যার পর মোটরসাইকেল মহড়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ বাধে।"
তিনি আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং আইনলঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনী পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে সব রাজনৈতিক দলকে সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।