আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) পর্যবেক্ষক দলকে সর্বোচ্চ স্তরের নিশ্চয়তা দিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রোববার (১১ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি আশ্বাস দেন যে, আগামী নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রকৃত অর্থেই এক উৎসবমুখর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
ইইউ-এর বিশাল পর্যবেক্ষক দল ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস আইজাবস (Ivars Ijabs) প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎকালে জানান, বাংলাদেশের এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তারা একটি বিশালাকার প্রতিনিধিদল পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ড. ইউনূস এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ‘Democratic Transition’ বা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি বড় স্বীকৃতি। আমরা একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর।”
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং
নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এবার অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনের দিন দেশের প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পোশাকে থাকবে ‘Body-worn Camera’। এই ক্যামেরাগুলো একটি ‘Central App’-এর মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত থাকবে, যা উপজেলা, জেলা, বিভাগ এমনকি ঢাকা থেকেও ‘Real-time’ মনিটর করা যাবে। এছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও স্ট্রাইকিং ফোর্স
ভোটের মাঠে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস উল্লেখ করেন, নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী ‘Rapid Response Striking Force’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও প্রচারণার সময়সূচি
প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচন কমিশন (EC) এবং অন্তর্বর্তী সরকার সব রাজনৈতিক দলের জন্য ‘Level Playing Field’ নিশ্চিত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে। তিনি বলেন, “সারা দেশে এখন নির্বাচনের জোয়ার বইছে, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।”
ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারের চ্যালেঞ্জ
সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা হিসেবে ‘Social Media Disinformation’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তারকে চিহ্নিত করেছেন ড. ইউনূস। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “পতিত স্বৈরাচারের সমর্থকরা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত বা বিঘ্নিত করতে অপপ্রচার চালাতে পারে। তবে এসব সাইবার চ্যালেঞ্জ এবং মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও সাইবার বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।”
ইইউ প্রতিনিধিদলের সাথে এই আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নির্বাচনী সদিচ্ছা আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পেল। একটি স্বচ্ছ ‘Referendum’ ও সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার অন্তর্বর্তী সরকার করেছে, এই বৈঠক তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।