আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ দুটি— বিশ্বের অন্যতম বড় স্ক্র্যাপ আমদানিকারক দেশ তুরস্কের পুনরায় বড় পরিসরে ক্রয় এবং শীতকালীন কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে (ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা) স্ক্র্যাপ সংগ্রহ ও সরবরাহে ঘাটতি। তুরস্ককে বৈশ্বিক স্ক্র্যাপ বাজারের “বেঞ্চমার্ক” ধরা হয়, কারণ দেশটি সমুদ্রপথে স্ক্র্যাপ আমদানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তুরস্কের মিলগুলো নিয়মিত কার্গো বুকিং শুরু করলে অন্যান্য গন্তব্যেও স্ক্র্যাপের প্রাপ্যতা কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। তাছাড়া, শীতকালে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ, পরিবহন ও বন্দর-লজিস্টিকস ধীর হওয়ায় তাৎক্ষণিক সরবরাহ কমে গিয়ে বিক্রেতারা উচ্চদামে অফার দেয়, যা দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও জোরালো করছে।
ভারতে আমদানি চাহিদার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় স্ক্র্যাপ প্রবাহে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত আমদানি বাজারে সক্রিয় থাকলে একই উৎস থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের প্রতিযোগিতা বাড়ে, যার ফলে প্রাপ্যতা কমে এবং দাম বৃদ্ধি পায়।
দেশীয় বাজারে রডের দাম সমন্বয় আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপের দাম বাড়ায় এর প্রভাব দেশের রডের বাজারেও দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কয়েকটি মিল ও ডিলার পর্যায়ে টনপ্রতি প্রায় ১,০০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। মিলগুলোর ভাষ্য, উচ্চ দামে কাঁচামাল বুকিং হলে দেশীয় বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কম দামে বিক্রি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, কারণ এতে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে হয়।
শিল্পনেতাদের মন্তব্য: বড় সংশোধন বকেয়া বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)-এর সাবেক সভাপতি এবং আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানওয়ার হোসাইন বলেন, মহামারির পর থেকে স্টিল শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর মধ্যে একটি। দীর্ঘদিন ধরে নেগেটিভ রিটার্নের কারণে ব্যাপক ক্যাপিটাল ইরোশন হয়েছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর মতে, “একটি বড় দাম সংশোধন অনেক দিন ধরেই বকেয়া। দাম সমন্বয় শুধু আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপ বাজারের অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া নয়—দীর্ঘ সময় ধরে খরচের নিচে দামে বিক্রির পর এটি একটি স্বাভাবিক বাজারগত গতিবিধিও”।
বিএসএমএ’র সেক্রেটারি জেনারেল সুমন চৌধুরী মনে করেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে। তিনি দ্রুত বেসরকারি খাতের সঙ্গে বসে পুরো নির্মাণ শিল্প পুনরুজ্জীবনে কাজ করার জন্য সরকার ও নতুন সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্মাণ খাতের সঙ্গে প্রায় ৩,৬০০টি শিল্প যুক্ত এবং এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ঢেউ এই বিপুল সংখ্যক শিল্পে ছড়িয়ে পড়ে।
বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য করণীয় বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন কম দামে বাজার থাকায় অনেক ক্রেতা ‘অপেক্ষা করে দেখি’ মনোভাব নিলেও আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে এবং রিপ্লেসমেন্ট কস্ট বাড়লে দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নির্মাণসামগ্রীর বাজারে আগাম ক্রয় পরিকল্পনা, স্থিতিশীল সরবরাহ এবং বাস্তবসম্মত দাম—সবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বিশেষজ্ঞরা আগামী কিছুদিন যে তিনটি সূচক নজরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, তা হলো— ১. তুরস্কের স্ক্র্যাপ বুকিংয়ের গতি, ২. ইউরোপ/যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালীন সংগ্রহ পরিস্থিতি এবং ৩. বাংলাদেশে কাঁচামালের রিপ্লেসমেন্ট কস্ট ও মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয়। বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ‘খরচের নিচে দামে’ থাকা রড বাজারও বেশি দিন একই জায়গায় স্থির থাকতে পারে না বলে তাঁরা মনে করেন।