নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নিজের ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবন নিয়ে বড়সড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের স্ত্রী আকি আবের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষে তিনি মূলত ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, তরুণদের উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের মতো তিনটি মৌলিক বিষয়ে মনোযোগ দেবেন।
রোববার (১১ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ‘ইনকারেজমেন্ট অব সোশ্যাল কন্ট্রিবিউশন’ (Social Contribution) ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে আকি আবে বর্তমানে বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন।
স্মৃতিচারণ ও আন্তরিকতার আবহ
বৈঠকের শুরুতে আকি আবে তার প্রয়াত স্বামী শিনজো আবের সঙ্গে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের গভীর ও উষ্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, দুই ব্যক্তিত্বের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্মৃতি রোমন্থনের মধ্য দিয়ে বৈঠকটি শুরু হয়। এসময় আকি আবে অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে জানতে চান, নির্বাচনের পর যখন অধ্যাপক ইউনূস রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেবেন, তখন তার কর্মপরিকল্পনা ঠিক কী হবে?
তিনটি মহাপরিকল্পনা: স্বাস্থ্য, তরুণ ও এসডিজি
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস তার ভবিষ্যৎ দর্শনের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তার পরবর্তী কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রে থাকবে তিনটি বিশেষ স্তম্ভ:
১. ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার বিপ্লব (Digital Healthcare): প্রধান উপদেষ্টা জানান, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করবেন। এর মূল হাতিয়ার হবে একটি আধুনিক Digital Health System। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন বিদেশ থেকেই একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশে থাকা তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তদারকি করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারেন, সে ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।
২. তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি (Youth Entrepreneurship): ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের ‘চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা’ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পরেও তার এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তরুণদের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন Social Business এবং স্টার্টআপ তৈরিতে তিনি দিকনির্দেশনা দেবেন।
৩. এসডিজি ও টেকসই উন্নয়ন: জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা SDG অর্জনে বিশ্বজুড়ে ড. ইউনূসের যে ভূমিকা রয়েছে, তা আরও জোরালো করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষা ও সামাজিক অসমতা দূরীকরণে তিনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবেন।
মার্চে জাপান সফর ও সামুদ্রিক গবেষণায় নতুন দিগন্ত
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, আগামী মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ‘সাসাকাওয়া ফাউন্ডেশনের’ (Sasakawa Foundation) বিশেষ আমন্ত্রণে জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে অধ্যাপক ইউনূসের। এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ সেখানে ওশান রিসার্চ (Ocean Research) বা সামুদ্রিক গবেষণাসহ বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের পথ ধরে ড. ইউনূসের এই পরিকল্পনাগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে গিয়েও কীভাবে বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখা যায়, ড. ইউনূস যেন তারই এক দূরদর্শী রোডম্যাপ তুলে ধরলেন আকি আবের সামনে।