১৭টি দপ্তর থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র অনুযায়ী, শিক্ষাছুটি, স্যাবাটিক্যাল কিংবা লিয়েন ছুটির জন্য একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের কার্যালয়, একাডেমিক শাখা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, প্রকৌশল দপ্তর, চিকিৎসাকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় ভান্ডার, নিজ বিভাগ, জুবেরী ভবন, পরিবহন দপ্তর, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কৃষি প্রকল্প, অগ্রণী ব্যাংক, গৃহ নির্মাণ ঋণ (তথ্য সেল) ও সংশ্লিষ্ট অনুষদসহ মোট ১৭টি দপ্তর থেকে আলাদা আলাদা দায়মুক্তিপত্র (ক্লিয়ারেন্স) সংগ্রহ করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে সংশ্লিষ্টরা 'রীতিমতো ধৈর্যের পরীক্ষা' হিসেবে অভিহিত করছেন।
অযৌক্তিক ক্লিয়ারেন্স ও ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের লিয়েন ছুটিতে থাকা সহযোগী অধ্যাপক মো. উজ্জল হোসাইন ১৭টি দপ্তরের ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মসজিদ থেকেও ছাড়পত্র নিতে হয়, যার কারণ হিসেবে বলা হয় মসজিদের লাইব্রেরি থেকে বই নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায়, প্রশাসনের কাছে শিক্ষকের আইডি সার্চ করেই লাইব্রেরি, মেডিকেল সেন্টার বা ব্যাংক লোনের সব তথ্য জানার কথা। প্রশাসনিক সমন্বয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকলে এত জায়গায় দৌড়ানোর প্রয়োজন হতো না।
রাবির নাট্যকলা বিভাগের একজন অধ্যাপক মসজিদ বা অন্যান্য অদ্ভুত জায়গা থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, শুধু নিজ বিভাগ ও হিসাব দপ্তর থেকে ক্লিয়ারেন্স নিলেই যথেষ্ট। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রুবায়েত জাহান মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রেই অদ্ভুত সব জায়গা থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হচ্ছে—যেমন মসজিদ, মন্দির এমনকি সেমিনার লাইব্রেরি—যা বর্তমান সময়ে বেশ অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে যেন শিক্ষককে অবিশ্বাস করা হচ্ছে এবং এটি মোটেই আপডেটেড নয়।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে বাধা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, স্টাডি লিভ বা স্যাবাটিক্যাল লিভ মূলত গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য হলেও ছুটি নিতে গিয়ে এত দপ্তরে দায়মুক্তিপত্র সংগ্রহ করতে হয় যে গবেষণার প্রস্তুতির সময়টাই শেষ হয়ে যায়। তিনি এই প্রক্রিয়াকে হতাশাজনক উল্লেখ করে বলেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কলারশিপের নির্দিষ্ট সময়সীমা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নতুন ও তরুণ শিক্ষকদের গবেষণার উদ্দেশ্যে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহ সৃষ্টি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষা ছুটিতে থাকা আরেক শিক্ষক জানান, বাইরের দেশগুলোতে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মেইল করলেই ছুটি কনফার্ম হয়ে যায়, সেখানে রাবির এই ১৭ দপ্তরের প্রক্রিয়া হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সমাধানের আশ্বাস সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ স্বীকার করেন যে ১৭টি জায়গায় আবেদন করতে হয় এবং দায়মুক্তিপত্র নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। মসজিদ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, লাইব্রেরি থেকে কারও নামে বই ইস্যু আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্যই এই ব্যবস্থা। তিনি আরও বলেন, ই-নথি বা অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হবে এবং খুব শিগগিরই তা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন আর এই দীর্ঘসূত্রতা থাকবে না।