রঙিন স্বপ্নের হাতছানি ও বাস্তবতার লড়াই
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী—যাকে বলা হয় দেশের ‘ফুলের রাজধানী’। ঋতুরাজ বসন্ত, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে প্রতি বছর এই সময়ে মাঠজুড়ে দেখা যায় রঙের উৎসব। গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস আর জারবেরার ঘ্রাণে ম ম করে চারপাশ। তবে ২০২৫ সালের এই মৌসুমটি ফুল চাষিদের জন্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। এবার উৎসবের ক্যালেন্ডারে যোগ হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির ‘National Election’ বা জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একদিকে নির্বাচনের আমেজ আর অন্যদিকে উৎসবের মরসুম—সব মিলিয়ে এক বিশাল ‘Market Potential’ তৈরি হলেও চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
নির্বাচন ও উৎসব: চাহিদার নতুন সমীকরণ
সাধারণত পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। কিন্তু এবার নির্বাচনের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি হওয়ায় রাজনীতির ময়দানেও ফুলের কদর বেড়েছে বহুগুণ। প্রার্থীদের বরণ, পথসভা এবং বিজয় মিছিলের জন্য গাঁদা ও রজনীগন্ধার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা আশা করছেন, নির্বাচনের ডামাডোলে ফুলের ‘Market Value’ বিগত বছরগুলোর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
স্থানীয় ফুলচাষি আজিজুর রহমানের মতে, বর্তমানে একটি গোলাপ যেখানে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, উৎসবের সময় তার দাম ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশেই রয়েছে শঙ্কার কালো মেঘ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন হওয়ার কারণে ওইদিন বাজার বসা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের আগের ও পরের ‘Law and Order’ পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক না থাকে, তবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারেন ব্যবসায়ীরা।
শতকোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ও রমজানের প্রভাব
গদখালী ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং উৎপাদিত ফুলের মান ভালো হওয়ায় ১০০ কোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রির একটি ‘Sales Target’ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি) ঠিক আগেই ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র রমজান শুরু হতে যাওয়ায় হিসাব কিছুটা ওলটপালট হয়ে গেছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানান, "রমজান শুরু হওয়ার কারণে ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানগুলো সীমিত হতে পারে, যা আমাদের ‘Demand and Supply Chain’-এ প্রভাব ফেলবে। এছাড়া নির্বাচনের কারণে পরিবহন বা ‘Logistics Support’ ব্যাহত হলে মাঠের ফুল মাঠেই নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে।"
যশোরের অর্থনীতিতে ফুলের অবদান
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যশোর অঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার চাষি ৬৪১ হেক্টর জমিতে ১৩ ধরনের ফুলের ‘Commercial Farming’ বা বাণিজ্যিক চাষ করছেন। দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই পূরণ হয় এই অঞ্চল থেকে। গদখালীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল চাষিদের ভাগ্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
উদ্বেগ কাটিয়ে ফেরার প্রতীক্ষা
চাষি মঞ্জুর আলমের মতো হাজারো কৃষক এখন দিনরাত পরিশ্রম করছেন মাঠের পরিচর্যায়। তারা চান একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা। যদি নির্বাচনের দিন কোনো বড় ধরনের গোলযোগ না হয় এবং বাজার স্থিতিশীল থাকে, তবে গদখালীর ইতিহাসে এবার রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে। অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাশার এই দোদুল্যমানতায় ঝুলে আছে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত রঙিন ফুলের হাসি চাষিদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে কি না।