পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক ও অভিযোগের ঝড়
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের হিদ এলাকার পোস্টাল ব্যালটের একটি ভিডিও ক্লিপ বিতর্কের জন্ম দেওয়ার পর সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এসব ঘটনার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক 'ধানের শীষ'-এর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের অভিযোগ, ব্যালটে প্রতীকটি এমনভাবে রাখা হয়েছে যে কাগজ ভাঁজ করলে তা চোখে না-ও পড়তে পারে, যা উদ্দেশ্যমূলক। অন্যদিকে, জামায়াত নেতারা এই ভিডিও ক্লিপগুলোকে অপপ্রচার দাবি করে পাল্টা অভিযোগ করছেন যে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তারা বলছেন, বিদেশে তাদের কোনো শাখা নেই।
ইসির কাছে বিএনপির ব্যাখ্যা ও দাবি
পোস্টাল ব্যালটের উন্মুক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বৈঠকের পর বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও আকারে আসছে যে বাসায় কয়েকশ ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে বা কোথাও কোথাও জব্দ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রবাসীদের কাছে যেসব ব্যালট পাঠানো হয়েছে, সেগুলো কীভাবে পাঠানো হয়েছে, তারা কীভাবে ভোট দেবে, কীভাবে স্ক্যান করবে? আর এক জায়গায় যদি দু-তিনশ ব্যালট পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে কী ব্যাখ্যা দেবেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে—এসব বিষয় আমরা নির্বাচন কমিশনকে জিজ্ঞেস করেছি।”
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে কিছু দলের নাম ও প্রতীক প্রথম লাইনে রাখা হলেও বিএনপির প্রতীক রাখা হয়েছে মাঝামাঝি, যা উদ্দেশ্যমূলক।
জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ
জামায়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে দাবি করে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ইসির প্রতি নির্বাচনে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী বিদেশে রাজনৈতিক দলের কোনো শাখা থাকতে পারে না, যা তারা সবসময় মেনে চলেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রতীক আলফাবেটিক্যাল (বর্ণানুক্রমিক) ক্রমে সাজানো হয়েছে এবং এখানে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি বলেও ইসির ব্যাখ্যা উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও হুঁশিয়ারি
সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটি রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় 'লাইভ ভেরিফিকেশন' বাধ্যতামূলক করা হতে পারে বলেও তিনি জানান। এর আগে ইসি সচিব জানিয়েছিলেন, ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপের স্থানে ১৬০টি ব্যালট ছিল এবং বাহরাইনের ডাক বিভাগ বিতরণ পদ্ধতির কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ভোটের স্বচ্ছতা
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, একই ঠিকানায় কয়েকশ ব্যালট বা ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম মনে করেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটারদের ভোটগ্রহণের শুরুতেই এমন ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং ভোটাররা অনাগ্রহী হতে পারেন। তিনি বলেন, “পোস্টাল ব্যালট চলে গেছে, এখন ফেরত আসার সময় এ রকম সমস্যা যেন না হয়।” তার মতে, কোনো আসনে পোস্টাল ভোট বেশি হলে তা ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
পোস্টাল ভোটের নিবন্ধনের পরিসংখ্যান
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশি প্রায় আট লাখ এবং দেশের ভেতরে ৭ লাখ ৬১ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধিত। প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন। আসনভিত্তিক নিবন্ধনে ফেনী-৩ আসন শীর্ষে (১৬ হাজার ৯৩ জন)।