বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অফ কমন্সে (House of Commons) দেওয়া এক ভাষণে প্রবীণ ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্রিটিশ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি (Official Statement) দাবি করেছেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি
বব ব্ল্যাকম্যান তার বক্তব্যে দাবি করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, "সে দেশে হিন্দুদের রাস্তায় হত্যা করা হচ্ছে এবং তাদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটছে।" এই পরিস্থিতিকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে (Foreign Office) বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার অনুরোধ জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও 'পলিটিক্যাল ইনক্লুসিভিটি'
বাংলাদেশে আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনকে ‘তথাকথিত মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ (Free and Fair Election) হিসেবে অভিহিত করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ব্ল্যাকম্যান। তিনি যুক্তি দেন যে, একটি প্রধান রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগকে—নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। জনমত জরিপের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, দেশটির অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে এই দলের ওপর। একটি বড় জনসমর্থনপুষ্ট দলকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচনই সত্যিকারের ‘Inclusive’ বা অংশগ্রহণমূলক হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একই সাথে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ইসলামি উগ্রপন্থীরা একটি গণভোট বা ‘Referendum’ আয়োজনের চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল সংবিধানকে (Constitution) আমূল বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের জন্য বড় হুমকি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ
বব ব্ল্যাকম্যানের এই উদ্বেগের জবাবে হাউজ অফ কমন্সের নেতা অ্যালান ক্যাম্পবেল জানান, যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ (Closely Monitoring) করছে। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে (Interim Government) সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
অ্যালান ক্যাম্পবেল স্পষ্ট করে বলেন, "সব ধরনের ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।" তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, মানবাধিকার এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি নিয়মিতভাবে ঢাকার নিকট ব্রিটিশ কূটনীতিকদের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলের চাপ ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য যে, বব ব্ল্যাকম্যান ছাড়াও আরও তিন ব্রিটিশ এমপি—জিম শ্যানন, জ্যাস আথওয়াল এবং ক্রিস ল—সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তারা উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের (International Observers) নিকট গ্রহণযোগ্য এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনই স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে না।
হাউজ অফ কমন্সের নেতা অ্যালান ক্যাম্পবেল জানিয়েছেন, বব ব্ল্যাকম্যানের উত্থাপিত এসব বিষয় তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের (Yvette Cooper) নজরে আনবেন। বাংলাদেশের এই অস্থির সময়ে যুক্তরাজ্যের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদারের এমন উদ্বেগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।