তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বসংগীতের দরবারে ভারতের নাম উজ্জ্বল করে চলেছেন এ আর রহমান। অস্কার ও গ্র্যামি জয়ী এই কিংবদন্তি সুরকার বরাবরই তার কাজের মাধ্যমে কথা বলতে পছন্দ করেন। তবে এবার বলিউডের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং গানের গুণগত মান কমে যাওয়া নিয়ে অভূতপূর্ব এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি। ‘মাদ্রাজের মোজার্ট’-এর মতে, বর্তমান হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বা বলিউডে সৃজনশীল শিল্পীদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে একদল কর্পোরেট গোষ্ঠী, যা সংগীতে মৌলিকত্ব হারানোর প্রধান কারণ।
কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ও সৃজনশীলতার অবক্ষয়
সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান বলিউডের গত আট বছরের আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আর সৃজনশীল মানুষের হাতে নেই। রহমানের ভাষায়, “বলিউডের বর্তমান কাঠামোর এমন পরিবর্তন হয়েছে যেখানে Creative Freedom বা সৃজনশীল স্বাধীনতার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে এসেছে। এখন ইন্ডাস্ট্রির মূল চাবিকাঠি এমন সব মানুষের হাতে, যাদের সৃজনশীলতার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংযোগ নেই।”
রহমান আরও যোগ করেন যে, আগে একজন সুরকার বা সংগীত পরিচালক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে বড় বড় Music Label এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলোই গানের সুর, গায়ক এবং শব্দশৈলী নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এর ফলে গানের যে শৈল্পিক আবেদন বা Originality, তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এবং বাণিজ্যিক ফরমুলার ভিড়ে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে কালজয়ী সংগীত।
বলিউড প্রজেক্টে অনুপস্থিতি ও ‘সাম্প্রদায়িক’ গুঞ্জন
গত প্রায় এক দশক ধরে বলিউডের বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে এ আর রহমানকে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে কি কোনো পরিকল্পিত কারণ রয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রহমান বেশ কৌশলী অথচ গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ উত্তর দিয়েছেন। তিনি জানান, এর পেছনে সাম্প্রদায়িক কোনো কারণ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, “সরাসরি কেউ আমাকে কিছু বলেনি ঠিকই, তবে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে অনেক ধরণের ফিসফাস (Whispers) আমি শুনি। হয়তো এটিই কারণ, অথবা কর্পোরেট রাজনীতির কোনো অংশ।”
মানসিক শান্তি ও ব্যক্তিজীবন
বলিউডের এই বদলে যাওয়া সমীকরণ নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও নিজের শিল্পীসত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন এই গুণী শিল্পী। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার কাজ পাওয়ার জন্য কারও কাছে ধরনা দিতে যান না। রহমান বলেন, “আমি আমার নিজের মতো করে সৃজনশীলতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্তিতে আছি। আমি এখন আমার Artistic Satisfaction-কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।”
বর্তমানে তিনি কাজের চেয়ে পরিবারকে সময় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তার মতে, ক্যারিয়ারের শুরুতে যে ব্যস্ততা তাকে গ্রাস করেছিল, এখন সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি একটি সুস্থ Work-Life Balance বজায় রাখতে পারছেন।
উপসংহার ও সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ
এ আর রহমানের এই মন্তব্য বলিউডের বর্তমান ‘Contractual Culture’ এবং শিল্পীর স্বাধীনতার ওপর কর্পোরেট খড়গের বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। যখন একজন অস্কারজয়ী শিল্পীকে গানের মৌলিকত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে সংগীতের এই ‘Business Model’ কোথাও না কোথাও গুরুতর সংকটে রয়েছে। রহমানের এই স্পষ্টবাদিতা ইন্ডাস্ট্রির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।