নেত্রকোনায় চাঞ্চল্যকর রুক্কু মিয়া হত্যা মামলায় স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে (২৮) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে নেত্রকোনার দায়রা জজ মোছা. মরিয়ম মুন মুঞ্জুরি এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে আদালত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে।
পারিবারিক কলহ ও নৃসংশতার নেপথ্য
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার রুক্কু মিয়ার সঙ্গে কলমাকান্দা উপজেলার রুবিনা আক্তারের বিয়ে হয়েছিল প্রায় ১০ বছর আগে। এই দম্পতির ঘরে দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। জীবিকার তাগিদে তারা গাজীপুরে বসবাস করতেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দাম্পত্য জীবনে ‘Family Dispute’ বা পারিবারিক কলহ চলছিল। তিক্ততা চরমে পৌঁছালে হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে রুবিনা তার সন্তানদের নিয়ে কলমাকান্দার কৈলাটি গ্রামে বাবার বাড়িতে চলে আসেন।
ঈদের আনন্দ পরিণত হলো বিষাদে
২০২১ সালের ১৪ মে ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। সন্তানদের প্রতি টান ও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে রুক্কু মিয়া ওইদিন বিকেলে তার শ্বশুর বাড়িতে যান। কিন্তু কে জানত, এই যাত্রাই হবে তার জীবনের শেষ যাত্রা। ওই রাতেই পরিবারের অগোচরে ঘুমন্ত অবস্থায় রুক্কু মিয়ার মাথায় কুঠার দিয়ে আঘাত করেন রুবিনা। নৃসংশ এই ‘Homicide’ বা হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
ঘটনার পরদিন ১৫ মে রুবিনার ভাই কৌশলে রুক্কু মিয়ার পরিবারকে জানান যে, রুক্কু গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। খবর পেয়ে নিহতের ভাই আসাদ মিয়া পুলিশসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিছানায় রক্তাক্ত অবস্থায় রুক্কু মিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহ উদ্ধার করে এবং প্রাথমিক সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
এই ঘটনায় নিহতের ভাই মো. আসাদ মিয়া বাদী হয়ে রুবিনা আক্তারকে একমাত্র আসামি করে কলমাকান্দা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত পরিচালনা করে আদালতে ‘Charge Sheet’ বা অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার চলাকালীন আদালত মোট ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও জনসন্তুষ্টি
রায় ঘোষণার সময় আদালত মন্তব্য করেন যে, দাম্পত্য কলহ থাকতে পারে, কিন্তু তার জেরে স্বামীকে এভাবে নৃসংশভাবে হত্যা করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (PP) আবুল হাসেম রায়ের পর গণমাধ্যমকে বলেন, “এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এটি সমাজে একটি বার্তা দেবে যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং নৃসংশ অপরাধের সাজা হিসেবে ‘Capital Punishment’ বা মৃত্যুদণ্ডই অবধারিত।”
নিহতের পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত এর কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত রুবিনা আক্তারকে নেত্রকোনা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।