এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের গুরুত্ব
আইরিন ট্রেসি মনে করেন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শূন্যতা পূরণ করছে। তিনি ক্যাম্পাস ঘুরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে 'অত্যন্ত অনন্য' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক ও সংঘাতপীড়িত জনগোষ্ঠীর নারীদের শিক্ষাদানের এই কাজটি এত লক্ষ্যভিত্তিক ও সুনির্দিষ্টভাবে করছে না। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা ও সৌজন্যবোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
অক্সফোর্ড ও এইউডব্লিউ: পারস্পরিক শিক্ষার ক্ষেত্র
অক্সফোর্ড বিশ্বের প্রাচীনতম এবং এইউডব্লিউ নবীনতম প্রতিষ্ঠান হলেও উভয়ের মৌলিক লক্ষ্য একই—সত্যের অনুসন্ধান, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণ করা। আইরিন ট্রেসি আশা করেন, অক্সফোর্ডের সুদীর্ঘ ইতিহাস এইউডব্লিউ-কে কঠিন সময়েও টিকে থাকার আত্মবিশ্বাস দেবে। অন্যদিকে, নতুন ও ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে এইউডব্লিউ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে, যা অক্সফোর্ডের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য শিক্ষণীয়। তিনি বাস্তুচ্যুত পটভূমি থেকে আসা নারীদের জন্য এইউডব্লিউ-এর বিশেষায়িত কাঠামোকে 'পর্যবেক্ষণযোগ্য ও অনুপ্রেরণাদায়ক' বলে বর্ণনা করেন।
নারী নেতৃত্বের পথে কাঠামোগত বাধা
শিক্ষাঙ্গন ও জনজীবনে নারীদের অগ্রগতি সত্ত্বেও নেতৃত্বের পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব কম থাকার কারণ হিসেবে ট্রেসি কাঠামোগত বাধাগুলো চিহ্নিত করেন। তিনি লিঙ্গভিত্তিক মজুরিবৈষম্য এবং 'গ্লাস সিলিং' (কাচের ছাদ)-এর কথা উল্লেখ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে মেয়েদের অংশগ্রহণ সমান হলেও পরিবার গঠন ও সন্তান নেওয়ার সময় কর্মজীবন থেকে তাদের ঝরে পড়ার হার বাড়ে। এর সমাধানে তিনি কর্মপরিবেশে আরও ন্যায্যতা ও নমনীয়তার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, নিয়োগকর্তাদের নমনীয় হতে হবে যেন নারীরা বিরতির পর সহজে কর্মজীবনে ফিরতে পারে। পুরুষদেরও এই পরিবর্তনে সক্রিয় সমর্থক হতে হবে। তিনি কোটাব্যবস্থার চেয়ে নারীদের খুঁজে বের করার এবং দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্ব দেন।
নারী নেতৃত্বের ওপর ভিন্ন প্রত্যাশা
নারীনেতৃত্বের ওপর প্রত্যাশা ও বিচার-মানদণ্ড পুরুষদের তুলনায় বেশি কি না, এমন প্রশ্নে আইরিন ট্রেসি স্বীকার করেন যে নারী নেতৃত্বকে কিছুটা ভিন্ন এবং কঠোরভাবে বিচার করা হয়। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, নেতৃত্বে সহজ হওয়ার জন্য কোনো নারীকে পুরুষের মতো হওয়ার দরকার নেই। নিজেকে বদলানোর প্রয়োজন নেই, বরং প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোকেই নমনীয় হতে হবে এবং নারীর বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখতে হবে। তিনি বলেন, পরিবর্তনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার জন্য পুরুষদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
মানববিদ্যা ও সামাজিক বিজ্ঞানের মূল্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর 'বাজারে বিক্রয়যোগ্য' বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার চাপ বাড়লেও আইরিন ট্রেসি মানববিদ্যা ও সামাজিক বিজ্ঞানের পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের আবিষ্কারগুলো সমাজে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা যদি না জানা যায়, তবে কেবল বিজ্ঞান থাকার কোনো অর্থ হয় না। জটিল সমস্যার সমাধান করতে হলে আন্তর্বিষয়ক সহযোগিতা জরুরি। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানববিদ্যার চেয়ে বিজ্ঞান ও গণিতের বিষয়গুলোকেই বেশি নাড়িয়ে দেবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সহাবস্থানে বাঁচতে হলে মানববিদ্যা ও সামাজিক বিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত মানুষের প্রয়োজন আরও বাড়বে। এই শাখাগুলোই আমাদের 'মানুষ হয়ে থাকার গুরুত্ব' মনে করিয়ে দেবে।
বাংলাদেশ সফর থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা
বাংলাদেশ সফর নিয়ে আইরিন ট্রেসি বলেন, তিনি যা ভেবেছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এইউডব্লিউ-এর উদ্যোগ তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তিনি এখানকার শিক্ষার্থীদের প্রবল আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ ও সংগ্রামের গল্পগুলো নিজের শিক্ষার্থী ও সন্তানদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন, যাতে তারা তাদের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এই সফর তাঁর নিজের জীবনের সুযোগ-সুবিধাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করতে সাহায্য করেছে।