যশোরের চৌগাছায় এক মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে। বাবার হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী যুবক তরিকুল ইসলাম। তুচ্ছ এক কারণ—দোকানে বসে ঘুমিয়ে পড়া—আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের জন্মদাতা পিতা কোদাল দিয়ে আঘাত করেন ছেলের মাথায়। টানা দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (DMCH) হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে তরিকুলের।
পারিবারিক কলহ ও ঘটনার নেপথ্য
নিহত তরিকুল ইসলাম যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলী ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে তরিকুল তাদের বাড়ির সামনের নিজস্ব মুদি দোকানে (Grocery Shop) বসে ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ কাজ বা অন্য কোনো কারণে ক্লান্ত তরিকুল একপর্যায়ে দোকানেই ঘুমিয়ে পড়েন।
দোকানে বিক্রেতা ঘুমিয়ে থাকায় ক্রেতারা ফিরে যাচ্ছিলেন—এই দৃশ্য দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তরিকুলের বাবা রবিউল ইসলাম। রাগের মাথায় হাতের কাছে থাকা একটি ধারালো কোদাল দিয়ে ঘুমন্ত ছেলের মাথায় সজোরে আঘাত করেন তিনি। মুহূর্তেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তরিকুল।
হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে: বাঁচার শেষ আকুতি
তরিকুলের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর (Refer) করেন। তবে মাথার আঘাত অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা অবস্থায় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইনি ব্যবস্থা ও পুলিশের পদক্ষেপ
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই নিহতের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) রেজাউল করিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নৃশংস ঘটনা। নিহতের চাচা আসাদুল ইসলাম বাদী হয়ে ঘাতক বাবা রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা মামলা (Murder Case) দায়ের করেছেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত বাবা পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সামাজিক উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞ মতামত
একটি সাধারণ মুদি দোকানে ঘুমিয়ে পড়ার মতো তুচ্ছ বিষয় কেন একজন বাবাকে খুনি করে তুলল, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অসহিষ্ণুতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণেই এ ধরনের বিচ্যুতি ঘটছে। একটি নিস্পাপ ঘুমন্ত মানুষের ওপর এমন হামলা কেবল অপরাধ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়।