এই ভূখণ্ডে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ বসবাস করে। এরা প্রত্যেকেই একটি করে সম্পূর্ণ জীবন, একটি করে গল্প, একটি করে সম্ভাবনা। এই মানুষগুলো নিজেদের মতো করে জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলেছে। তবুও এই মানুষগুলো আজও সমাজের তথাকথিত 'এলিট শ্রেণি' বলে দাবি করা কিছু মানুষের শোষণ আর বৈষম্যের শিকার। এই ভণ্ড দাবি আর মুখোশধারী ক্ষমতার কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করাই আজ নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত।
শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ও প্রতিভার মূল্য নতুন বাংলাদেশে একজন মানুষ মিস্ত্রি হোক বা রাজমিস্ত্রি, কামার বা কুমার— তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ মানুষ তার পেশায় নয়, পরিচিত হয় তার প্রতিভা ও শ্রমের গুণে। এই মানুষগুলোই তাদের হাতের স্পর্শে বাস্তব জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরি করে। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে রাস্তা দিয়ে চলি— সবকিছুর পেছনেই আছে তাদের শ্রম। অথচ এই মানুষগুলোই আজও সমাজে অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। আধুনিকতার সব আলোর ঝলকানির মাঝেও তারা থেকে যায় অন্ধকার প্রান্তে।
রাষ্ট্র যখন শ্রমের স্বীকৃতি দেয় না কৃষক যিনি সূর্য ওঠার আগেই মাঠে নামেন, তাঁর সন্তান ঠিকমতো শিক্ষা পায় না। পরিচ্ছন্নতাকর্মী যিনি শহর পরিষ্কার রাখেন, সমাজ তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখে। গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, নার্স, শিক্ষক— এঁরা সবাই এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের শ্রমেই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ রাষ্ট্র তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই বাস্তব হবে, যখন শ্রম আর প্রতিভাকে শ্রেণির চোখে দেখা বন্ধ হবে। যখন একজন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হবে তার মানবিকতা, দায়বদ্ধতা আর সৃজনশীলতায়।
হাসনাত আব্দুল্লাহ: নতুন প্রজন্মের অহংকার এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের অহংকার হিসেবে উঠে আসে হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো নাম। তিনি কোনো ক্ষমতাধর পরিবারের উত্তরাধিকারী নন। তিনি এসেছেন এক অতি সাধারণ পরিবার থেকে। তাঁর বাবা সন্তানের মধ্যে ভয় নয়, আত্মসম্মান গড়ে তুলেছেন। এই শিক্ষাই হাসনাতকে তৈরি করেছে সাহসী, স্পষ্টভাষী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে। হাসনাতের গল্প আসলে ব্যতিক্রম নয়; এটি সম্ভাবনার প্রতীক। এই দেশ এমন হাজারো হাসনাতের জন্ম দিতে পারে, যদি সমাজ বংশ নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দেয়।
গণঅভ্যুত্থানে হাসনাতের নেতৃত্ব হাসনাতের প্রকৃত পরিচয় কেবল সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ নয়। গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে তিনি যে সাহস, সচেতনতা ও নেতৃত্ব দেখিয়েছেন, তা একটি প্রজন্মের মানসিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সংকটের মুহূর্তে যখন অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে, তখন হাসনাত সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন সেই মানুষের, যাদের কথা শোনার কেউ ছিল না। আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে যখন বিভ্রান্তি, হতাশা আর ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তখনো তিনি স্থির থেকেছেন। তাঁর নেতৃত্বের বড় গুণ হলো, তিনি মানুষকে ব্যবহার করেননি, মানুষকে বিশ্বাস করেছেন।
রাজমিস্ত্রির ছেলের বাস্তব শিক্ষা হাসনাত আব্দুল্লাহ একজন রাজমিস্ত্রির ছেলে। এই পরিচয় তাঁর দুর্বলতা নয়, এটি তাঁর শক্তির মূল। সে জানে কীভাবে গড়তে হয়, কারণ সে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে তাঁর বাবার হাতে ইট, বালি আর সিমেন্ট কীভাবে ধীরে ধীরে একটি ঘরে রূপ নেয়। সে জানে ভিত্তি মজবুত না হলে দেয়াল দাঁড়ায় না। এই বাস্তব শিক্ষা তাঁকে ধৈর্যশীল ও দায়বদ্ধ নেতৃত্বের পাঠ দিয়েছে। সে বোঝে, দেশ গড়া মানে কাগজে নকশা আঁকা নয়, মাটিতে নেমে কাজ করা। এই কারণেই তাঁর নেতৃত্ব আলাদা। সে শুধু কথা বলে না, সে গড়তে জানে।