• প্রযুক্তি
  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ডিজিটাল প্রচারে এআই-এর ডিপফেক আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ডিজিটাল প্রচারে এআই-এর ডিপফেক আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ

দেয়ালজুড়ে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ডিজিটাল প্রচার এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। তবে ডিপফেক ভিডিও ও এআই-জেনারেটেড প্রোপাগান্ডা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সংকট।

প্রযুক্তি ১ মিনিট পড়া
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ডিজিটাল প্রচারে এআই-এর ডিপফেক আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নজিরবিহীন বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রথাগত প্রচারের স্থান দখল করে নিয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এবারের নির্বাচনে দেয়ালজুড়ে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ভোটারদের মন জয়ের লড়াই এখন সরাসরি চলে এসেছে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। তবে এ আধুনিক প্রচারের সমান্তরালে এক নতুন ও ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর অপব্যবহার। বিশেষ করে 'ডিপফেক' ভিডিও, এআই-জেনারেটেড প্রোপাগান্ডা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এখন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। খোদ নির্বাচন কমিশনও (ইসি) এই উদীয়মান ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণায় ডিপফেক-এর ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর ব্যবহার প্রচার কার্যক্রমে যেমন গতি এনেছে, তেমনি তৈরি করেছে চরম ঝুঁকি। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠস্বর ও অবয়ব হুবহু নকল করে তৈরি করা হচ্ছে 'ডিপফেক' ভিডিও। এসব ভিডিওতে নেতাদের এমন সব বিতর্কিত বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে, যা তারা কখনোই বলেননি। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবাদ উপস্থাপকের আদলে ভিডিও বানিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা সাধারণ ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে উসকানিমূলক বা একপাক্ষিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা ভোটারদের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।

সাইবার স্পেসে আক্রমণের তীব্রতা ও নিয়ন্ত্রণের লড়াই

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সাইবার স্পেসে আক্রমণের তীব্রতা তত বাড়ছে। ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন তথ্যের প্রধান উৎস। কিন্তু তথ্যের সত্যতা যাচাইর অভাব এ মাধ্যমগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একটি বানোয়াট তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ এলাকায় যেখানে ডিজিটাল লিটারেসি কম, সেখানে এ ধরনের অপপ্রচার বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ইসির বিশেষ সেল গঠন

এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ)।

পূর্বের নজির ও প্রধান চ্যালেঞ্জ

বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ডিপফেকের মতো ঘটনা বহু ঘটেছে। জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (কেএএস) এক প্রতিবেদনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমন একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর একটি ভুয়া বা 'ডিপফেক' ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন সম্প্রতি বলেন, 'এখন তো এআইর যুগ। এআই নিয়ে আমি শঙ্কা একদম প্রথম থেকেই প্রকাশ করে আসছিলাম যে—এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।'

বিশ্লেষকদের মতে, এখন এআই দিয়ে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরি করা যাচ্ছে, যা আসলের মতো মনে হয়। একে বলা হয় ডিপফেক। এর পাশাপাশি সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে তৈরি 'চিপফেক'-এর মাধ্যমেও ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

অপতথ্য ছড়ানোর কৌশল ও পরিসংখ্যানে বৃদ্ধির হার

ফ্যাক্টচেকার ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপতথ্য ছড়াতে ডিপফেক ও চিপফেকের মতো ১০টি কৌশল বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে: সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া; পুরোনো ছবি বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন; এবং সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা তত বাড়ছে। এ পর্যন্ত একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও আলোচিত অন্তত ১৩ নেতা-নেত্রী এমন ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ভিডিও; মোট তথ্য যাচাইয়ের ৬৬ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। ডিসেম্বরে রাজনৈতিক ভুল তথ্যের সংখ্যা ছিল ৪৪৬টি, এবং মিথ্যা দাবির সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রস্তুতি ‘শূন্য’

আগামী নির্বাচনে এআইর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, 'শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনেই এআই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তবে বাংলাদেশে এ চ্যালেঞ্জ অনেক প্রকট। নির্বাচন কেন্দ্র করে বটবাহিনীর যে অপপ্রচার, সেটা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশন অথবা সরকারের পাল্টা কোনো বটবাহিনী নেই। সত্যি বলতে আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই শূন্য।'

Tags: bangladesh election election commission ncsa cyber security 13th parliament election digital campaign deepfake propaganda misinformation ai threat