দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে যখন একের পর এক বিতর্কের দাবানল জ্বলছে, ঠিক তখনই নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়লেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-এর সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। রোববার (২৫ জানুয়ারি) গভীর রাতে অনেকটা নিভৃতেই অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই দেশ ছাড়ার খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘মিথ্যা সংবাদ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বিসিবি প্রধান। বিমানবন্দর সূত্রের বরাত দিয়ে তার এই আকস্মিক প্রস্থানের খবরটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
‘মিথ্যা সংবাদ’ বনাম নাটকীয় দেশত্যাগ
রোববার বিকেল থেকেই সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, বিসিবি সভাপতি কোনো রিটার্ন টিকিট ছাড়াই দেশ ছাড়ছেন। এমন খবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন বুলবুল। বিকেলে গণমাধ্যমের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি দাবি করেছিলেন, বিসিবিতে কাজের চাপে তিনি নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছেন না, ফলে বিদেশ যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বুলবুল তখন বলেছিলেন, “আমি সারাদিন অফিসে কাজ করেছি, ইনশাআল্লাহ কালকেও করব। এখন অনেক কাজের চাপ (Work Pressure)। পরিবারের কাছে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই। আমি জানি না কোথা থেকে এসব নিউজ আসে। ফলস নিউজ (False News) আমাদের সবার কাজের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।” কিন্তু দিন শেষে তার সেই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। গভীর রাতে তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইটে উঠতে দেখা যায়।
রিটার্ন টিকিট ছাড়াই গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া
বিমানবন্দর সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিসিবি সভাপতি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন। সাধারণত তিনি দুই সপ্তাহের জন্য পরিবারের কাছে অস্ট্রেলিয়া গেলেও এবার তার ফিরে আসার কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা ‘রিটার্ন টিকিট’ নেই বলে গুঞ্জন রয়েছে। দেশের ক্রিকেটের এমন এক ক্রান্তিকালে তার এই অঘোষিত প্রস্থান নিয়ে বিসিবি মহলে ব্যাপক কানাঘুষা চলছে।
খাদের কিনারায় দেশের ক্রিকেট: নেপথ্যের অস্থিরতা
বিসিবি সভাপতির এই দেশত্যাগ এমন এক সময়ে ঘটল যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একাধিক ফ্রন্টে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিচের বিষয়গুলোই বোর্ডকে অস্থির করে তুলেছে:
১. আইসিসি ও বিশ্বকাপ জটিলতা: মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল (IPL) থেকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে ভারত ও বিসিবির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত সফরে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় আইসিসি (ICC) বাংলাদেশকে আসন্ন বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে।
২. বিপিএলে ফিক্সিং বিতর্ক: সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (BPL)-এ এক প্রভাবশালী বিসিবি পরিচালকের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের (Match Fixing) গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে তদন্তের দাবি উঠলেও বোর্ড এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
৩. পরিচালকদের পদত্যাগের হিড়িক: গত পরশুই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন এক পরিচালক (Director)। গুঞ্জন রয়েছে, আরও অন্তত দুজন প্রভাবশালী পরিচালক খুব শিগগিরই পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।
নেতৃত্বের সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ক্রিকেট বোদ্ধারা মনে করছেন, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ এই ‘টালমাটাল অবস্থা’ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েই কি সভাপতি বুলবুল ‘নিরাপদ দূরত্ব’ বজায় রাখতে দেশ ছাড়লেন? প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তির এমন অনুপস্থিতি বিসিবির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন আইসিসির সঙ্গে দর কষাকষি এবং দেশের মাটিতে ফিক্সিং কেলেঙ্কারির সুরাহা হওয়া প্রয়োজন, তখন সভাপতির এই বিদেশযাত্রা ক্রিকেটের ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার অভিভাবক সংস্থাটির এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, বিসিবি প্রধানের এই ‘অস্ট্রেলিয়া সফর’ আদতেই কি সংক্ষিপ্ত কোনো পারিবারিক ভ্রমণ, নাকি দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রস্থানের ইঙ্গিত।