বৈরুত, লেবানন: মধ্যপ্রাচ্যে অব্যাহত উত্তেজনার মাঝে লেবাননের গণমাধ্যম জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক টায়ার (Tyre) শহরে ইসরাইলি বিমান হামলায় (Air Strike) প্রাণ হারিয়েছেন আলী নুর আল-দিন নামের এক টেলিভিশন উপস্থাপক। তিনি হিজবুল্লাহ সমর্থিত জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম ‘আল-মানার’ (Al-Manar) টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ ও আল-মানার কর্তৃপক্ষ এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
টার্গেট যখন মিডিয়া কর্মীরা
আল-মানার টিভি জানিয়েছে, আলী নুর আল-দিন দীর্ঘ সময় ধরে তাদের চ্যানেলে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। সোমবার টায়ার শহরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন। হিজবুল্লাহ এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক হামলা’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, কোনো উস্কানি ছাড়াই অসামরিক স্থাপনা ও গণমাধ্যম কর্মীদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রীর তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
এই ঘটনার পর লেবাননের তথ্যমন্ত্রী পল মরকোস (Paul Morcos) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “ইসরাইলি আগ্রাসন এখন আর কোনো সীমারেখা মানছে না। তাদের এই ‘Targeted Attack’ থেকে সাংবাদিক বা সাধারণ মিডিয়া ক্রু (Media Crew)—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না।”
মন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের (International Community) কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা শোকসন্তপ্ত মিডিয়া পরিবারের প্রতি গভীর সংহতি ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বন্ধে বিশ্বনেতাদের এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
ইসরাইলের দাবি ও যুদ্ধের বর্তমান চিত্র
অন্যদিকে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এই হামলার কথা স্বীকার করেছে। তবে তাদের দাবি অনুযায়ী, আলী নুর আল-দিন কেবল একজন উপস্থাপক ছিলেন না, বরং তিনি হিজবুল্লাহর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একই দিনে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ এলাকার কাছে কাফার রুম্মানে (Kafr Roummane) পৃথক আরও একটি হামলা চালিয়েছে ইসরাইল, যেখানে আরও দুইজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, টায়ার এবং সংলগ্ন এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের মহড়া বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিপজ্জনক হয়ে উঠছে লেবাননের রণক্ষেত্র
সাংবাদিকদের সুরক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কমিটি ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (CPJ)-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তবে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০ ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ‘Media Personnel’ বা গণমাধ্যম কর্মীদের যেভাবে প্রাণ হারাতে হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর জন্য বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভয়াবহ এই সংঘাত লেবাননের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আলী নুর আল-দিনের মৃত্যু সেই আগুনেই যেন নতুন করে ঘি ঢেলে দিল।