ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত দমন-পীড়নের লোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে। তেহরানের হাসপাতালে লাশের স্তূপ, বহুতল ভবনের ছাদে স্নাইপারদের (Snipers) অবস্থান এবং নির্বিচারে গুলিবর্ষণের একাধিক নতুন ভিডিও যাচাই করে এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে ‘বিবিসি ভেরিফাই’। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বহুগুণ বেশি হতে পারে।
হাসপাতালে লাশের স্তূপ: মর্মান্তিক দৃশ্য
বিবিসি ভেরিফাই এবং বিবিসি পার্সিয়ান কর্তৃক বিশ্লেষণকৃত ভিডিওগুলোতে পূর্ব তেহরানের তেহরানপার্স হাসপাতালের মর্গের ভেতরে লাশের পাহাড় দেখা গেছে। ভিডিও বিশ্লেষণ করে হাসপাতালের ভেতরে অন্তত ৩১টি মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের প্রবেশপথের বাইরে আরও সাতটি ‘বডি ব্যাগ’ (Body Bag) পড়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভির ডাকা দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চলাকালীন এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পশ্চিম তেহরানের একটি মহাসড়কে ধারণকৃত ভিডিওতে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ এবং মানুষের আর্তনাদ স্পষ্টভাবে শোনা গেছে।
পরিসংখ্যানে বিভীষিকা: মৃত্যুমিছিলের প্রকৃত চিত্র
গত ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার দেশজুড়ে কঠোর ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ (Internet Blackout) বা সংযোগ বিচ্ছিন্নতা জারি করায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া ছিল দুরুহ। তবে মার্কিন ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হ্রানা’ (HRANA) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩৩ জনই সাধারণ বিক্ষোভকারী। অন্যদিকে, নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (IHR) আরও ভয়াবহ দাবি করেছে। তাদের মতে, সংঘাতের প্রকৃত ভয়াবহতা বিবেচনায় নিলে নিহতের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।
নজরদারি বনাম প্রতিরোধ: স্নাইপার ও সিসিটিভি
ইরানের বিভিন্ন শহরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। উত্তর-পূর্বের শহর মাশহাদে একটি ভবনের ছাদে দুজন স্নাইপারের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে, যাদের পাশে রাখা ছিল দূরপাল্লার বড় রাইফেল। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় নজরদারি এড়াতে বিক্ষোভকারীদের সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা ধ্বংস করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, তেহরানে একজন ব্যক্তি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে উঠে ক্যামেরা ভেঙে ফেলছেন এবং নিচে থাকা জনতা তাকে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে।
ডিজিটাল দেওয়াল ও বিশ্ববাসীর উদ্বেগ
ইরানি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, সহিংসতায় ৩ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তারা কৌশলে দাবি করেছে যে, নিহতদের একটি বড় অংশই নিরাপত্তা কর্মী অথবা তথাকথিত ‘দাঙ্গাবাজদের’ হাতে আক্রান্ত সাধারণ পথচারী। বর্তমানে দেশটিতে ইন্টারনেটের ওপর কঠোর কড়াকড়ি থাকলেও অত্যন্ত সংবেদনশীল ভিডিওগুলো অনেকেই ‘স্টারলিংক’ (Starlink) স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা উন্নত ‘ভিপিএন’ (VPN) ব্যবহার করে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী ইন্টারনেট শাটডাউনের কারণে দেশটির অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি বহু অজ্ঞাত হত্যাকাণ্ডের তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি। তাদের মতে, সামনের দিনগুলোতে সেন্সরশিপ কিছুটা শিথিল হলে এই দমন-পীড়নের আরও ভয়ঙ্কর চিত্র এবং ভিডিও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হবে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।