দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষা আর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে বড় জয় পেল বাংলাদেশ। সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের দায়ে কানাডীয় বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসকে (Niko Resources) বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক আদালত। ওয়াশিংটনভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস' (ICSID) এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান এই যুগান্তকারী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায়ে নাইকোকে মোট ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (বর্তমান বিনিময় হার ১২৩ টাকা হিসাবে যা প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিস্ফোরণ ও মহাবিপর্যয়ের ইতিকথা
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৩ সালে, যখন সুনামগঞ্জের ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব পায় নাইকো। তবে শুরু থেকেই তাদের কারিগরি সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (International Standard) বজায় না রেখে খনন কাজ চালানোর ফলে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন—পরপর দুবার সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটে।
সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাস। শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়ই নয়, বিস্ফোরণের তীব্রতায় তছনছ হয়ে যায় আশপাশের জনপদ, কৃষি জমি ও জীববৈচিত্র্য। স্থানীয় পরিবেশের ওপর নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় (Environmental Disaster)।
আইনি লড়াই ও ইকসিড-এর পর্যবেক্ষণ
ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুরুতে পেট্রোবাংলা ৭৪৬ কোটি টাকা দাবি করলেও নাইকো তা দিতে অস্বীকার করে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে গড়ায়। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নাইকোর অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং ‘গ্লোবাল পেট্রোলিয়াম ইন্ডাস্ট্রি’র নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থতার কারণেই এই মহাবিপর্যয় ঘটেছিল।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (Bapex) প্রায় ৯,২৫০ কোটি টাকার বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি মামলা করেছিল। আজকের এই রায় সেই দীর্ঘ আইনি সংগ্রামেরই একটি সফল পরিণতি।
ক্ষতিপূরণের খতিয়ান: ডলার বনাম টাকা
ইকসিড-এর চূড়ান্ত নির্দেশ অনুযায়ী, নাইকোকে পুড় যাওয়া গ্যাসের দাম বাবদ ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য আরও ২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। বর্তমান বাজারমূল্যে যা ৫১৬ কোটি টাকার সমান। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের এই আইনি বিজয় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নতুন স্বপ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাতক পূর্ব ও পশ্চিম গ্যাসক্ষেত্রে বর্তমানে ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) গ্যাসের বিশাল মজুতের সম্ভাবনা রয়েছে। এই রায় আসার পর স্থগিত থাকা উত্তোলন কাজ নতুন করে শুরু করার পথ প্রশস্ত হলো।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এই রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে কূপ খননের জন্য অলরেডি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি (DPP) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখন আইনি পরামর্শ নিয়ে খুব দ্রুত এই বিশাল গ্যাস মজুত উত্তোলনের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
এই ঐতিহাসিক বিজয় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জ্বালানি অধিকার এবং আইনি সক্ষমতার এক জোরালো প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।