দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’। তবে ২০২৩ সালের পুরস্কার প্রাপ্তদের তালিকা ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিশেষ করে ‘আজীবন সম্মাননা’ (Lifetime Achievement Award) বিভাগে এমন দুই প্রথিতযশা ব্যক্তির নাম ঘোষণা করা হয়েছে, যারা ইতোমধ্যে প্রয়াত। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এই সম্মাননা কেবল জীবিত ব্যক্তিদের দেওয়ার বিধান রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র অঙ্গন ও সচেতন মহলে নজিরবিহীন অসংগতির প্রশ্ন উঠেছে।
নিয়ম বনাম সিদ্ধান্ত: কোথায় গলদ?
২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞাপন (Official Circular) প্রকাশ করেছিল, তার দ্বিতীয় নিয়মে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—আজীবন সম্মাননার জন্য কেবল জীবিত ব্যক্তিদেরই বিবেচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মৃত ব্যক্তি এই ক্যাটাগরিতে মনোনীত হওয়ার যোগ্য নন।
অথচ গত ২৯ জানুয়ারি ঘোষিত তালিকায় দেখা যায়, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং বরেণ্য চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে যৌথভাবে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। নীতিমালাকে এভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মৃত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় পুরস্কারের গ্রহণযোগ্যতা ও ‘Credibility’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের দায় নিতে নারাজ জুরি বোর্ড
এই অসংগতি নিয়ে চারদিকে শোরগোল শুরু হলে মুখ খুলেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জুরি বোর্ডের অন্যতম সদস্য বরকত হোসেন পলাশ। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, জুরি বোর্ডের কাজ কেবল নামের প্রস্তাব করা, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের।
পলাশ আরও যোগ করেন, “২০২৩ সালের জুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে যে প্রাথমিক তালিকা বা ‘Nomination’ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এই দুই প্রয়াত গুণীজনের নাম ছিল না। মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তীকালে এই নামগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।” জুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর করা হয়েছে এবং একটি সংশোধনী আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সংশোধনের আশ্বাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের এই পুরস্কারের জন্য ২৮টি বিভাগে মোট ৩০ জন শিল্পী ও কলাকুশলীকে মনোনীত করেছে। পুরস্কারের তালিকা প্রকাশের পর থেকেই তারেক মাসুদ ও আব্দুল লতিফ বাচ্চুর নাম নিয়ে যে আইনি ও নীতিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে মন্ত্রণালয় ‘Internal Review’ শুরু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে একটি সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
সৃজনশীল অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তারেক মাসুদ ও আব্দুল লতিফ বাচ্চু—উভয়েই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিংবদন্তি। তাদের সম্মাননা জানানো নিয়ে কারো দ্বিমত না থাকলেও, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে এমন পদক্ষেপকে ‘অপেশাদারিত্ব’ হিসেবে দেখছেন সিনেমা বোদ্ধারা। তাদের মতে, কোনো পুরস্কারের ‘Market Value’ বা মর্যাদা বজায় রাখতে হলে নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। যদি তাদের মরণোত্তর সম্মাননা দিতেই হয়, তবে তা আজীবন সম্মাননা ক্যাটাগরিতে না দিয়ে বিশেষ কোনো সম্মাননা হিসেবে প্রদান করা যেত।
এখন দেখার বিষয়, মন্ত্রণালয় তাদের এই বড় ধরনের ‘Policy Violation’ কীভাবে সংশোধন করে এবং জাতীয় চলচ্চিত্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে কী পদক্ষেপ নেয়।