• ব্যবসায়
  • ইতিহাস গড়ল ওয়ালমার্ট: টেক জায়ান্টদের সারিতে প্রথম ‘রিটেইল কিং’ হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে

ইতিহাস গড়ল ওয়ালমার্ট: টেক জায়ান্টদের সারিতে প্রথম ‘রিটেইল কিং’ হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
ইতিহাস গড়ল ওয়ালমার্ট: টেক জায়ান্টদের সারিতে প্রথম ‘রিটেইল কিং’ হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে

অ্যামাজন-গুগলের রাজত্বে ভাগ বসিয়ে প্রথম খুচরা বিক্রেতা হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে ওয়ালমার্ট; নেপথ্যে এআই বিপ্লব ও সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক কৌশল।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল মার্কিন খুচরা বিক্রেতা জায়ান্ট ওয়ালমার্ট। ইতিহাসে প্রথম কোনো পিওর-প্লে খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বা Market Value ১ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। এক বছর ধরে চলা শেয়ার বাজারের শক্তিশালী র‍্যালির ওপর ভর করে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ওয়ালমার্টকে এনভিডিয়া, অ্যাপল এবং অ্যালফাবেটের মতো গ্লোবাল টেক জায়ান্টদের কাতারে নিয়ে এসেছে।

টেক জায়ান্টদের অভিজাত ক্লাবে নতুন সদস্য

সাধারণত ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধনকে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ওয়ালমার্ট প্রমাণ করেছে, ‘ওল্ড ইকোনমি’ বা প্রথাগত ধারার কোম্পানি হয়েও সঠিক প্রযুক্তিগত সংমিশ্রণে এই উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব। বর্তমানে মার্কিন শেয়ার বাজারে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কোম্পানিগুলোর তালিকায় রয়েছে এনভিডিয়া (৪.৫ ট্রিলিয়ন), অ্যালফাবেট (৪.১ ট্রিলিয়ন), অ্যাপল (৩.৯ ট্রিলিয়ন), মাইক্রোসফট (৩.১ ট্রিলিয়ন), এবং অ্যামাজন (২.৬ ট্রিলিয়ন)। সেই তালিকায় নবীনতম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়ে ওয়ালমার্ট এখন খুচরা বিক্রয় শিল্পের অবিসংবাদিত সম্রাট।

সফলতার নেপথ্যে ‘ডুয়াল স্ট্র্যাটেজি’

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ালমার্টের এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে রয়েছে তাদের অনন্য ‘ডুয়াল স্ট্র্যাটেজি’। একদিকে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিম্ন আয়ের মূল ভোক্তা ভিত্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, অন্যদিকে প্রিমিয়াম সার্ভিস ও সুবিধার মাধ্যমে উচ্চ আয়ের ক্রেতাদেরও আকৃষ্ট করেছে। গত এক দশকে ওয়ালমার্টের শেয়ার দর বেড়েছে ৪৬৮ শতাংশ, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) সূচকের প্রবৃদ্ধিকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মুদি কেনাকাটায় ব্যয় হওয়া প্রতি ৪ ডলারের মধ্যে ১ ডলারই জমা হয় ওয়ালমার্টের ক্যাশ কাউন্টারে।

এআই এবং ডিজিটাল বিপ্লবে আমূল পরিবর্তন

ওয়ালমার্ট এখন আর কেবল শারীরিক স্টোর-ভিত্তিক কোম্পানি নেই। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি তার অনলাইন মার্কেটপ্লেসকে ৫০ কোটিরও বেশি পণ্যে সমৃদ্ধ করেছে। অ্যামাজন প্রাইমের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ‘ওয়ালমার্ট প্লাস’ (Walmart+) সেবা এবং দ্রুততম ১ ঘণ্টার ডেলিভারি সিস্টেম তাদের ব্যবসায়িক মডেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এছাড়া, প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিজ্ঞাপন ব্যবসা কোম্পানির প্রফিট মার্জিন বাড়িয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় চমক এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থেকে। ইনভেন্টরি পূর্বাভাস, সাপ্লাই-চেইন অটোমেশন এবং সার্চ অপ্টিমাইজেশনের জন্য ওয়ালমার্ট বিপুল অর্থ খরচ করেছে। এমনকি ওপেনএআই (OpenAI) ও গুগলের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে তারা শপিং চ্যাটবট তৈরি করেছে, যা গ্রাহকদের কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরও সহজতর করেছে। এই টেক-ফোকাসড দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সম্প্রতি ওয়ালমার্টকে মর্যাদাপূর্ণ নাসডাক-১০০ (Nasdaq-100) সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক পথচলা ও বর্তমান অবস্থান

১৯৬২ সালে আরকানসাসের রজার্সে স্যাম ওয়ালটনের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৪ হাজার ৬০০টিরও বেশি স্টোরের এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯৭০ সালে মাত্র ১৬.৫০ ডলারে আইপিও (IPO) ছেড়ে শেয়ার বাজারে প্রবেশ করা কোম্পানিটি আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। গত ১ ফেব্রুয়ারি জন ফার্নার নতুন গ্লোবাল সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অ্যামাজন, অ্যালডি ও কস্টকোর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও ২ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন

নেভেলিয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা লুই নেভেলিয়ারের মতে, ওয়ালমার্টের এই জয়যাত্রা কেবল শুরু। তিনি মনে করেন, আগামী কয়েক বছরে কোম্পানিটির বাজার মূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। মূল্যস্ফীতি, শুল্ক চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ওয়ালমার্টের ‘প্রতিদিনের কম দাম’ (Everyday Low Price) কৌশল মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

প্রযুক্তি ও রিটেইল ব্যবসার এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ওয়ালমার্টকে কেবল একটি দোকান থেকে একটি গ্লোবাল টেক-রিটেইল ইকোসিস্টেমে রূপান্তরিত করেছে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এই মাইলফলক কেবল সংখ্যার বিচারেই নয়, বরং প্রথাগত ব্যবসার আধুনিকায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে।

Tags: stock market tech giant global economy walmart market cap trillion dollar retail news ai investment