আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা
নতুন অধ্যাদেশে সরাসরি আইনিভাবে ক্ষমতায়িত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ সকল বাণিজ্যিক ডাক ও কুরিয়ার অপারেটরদের লাইসেন্স প্রদান করবে এবং তাদের সেবার মান ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি ডাকসেবা খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নজরদারি করবে। বিশেষত, বাংলাদেশ ডাক যেন সার্বজনীন সেবার জন্য প্রাপ্য সরকারি সংস্থান অন্য প্রতিযোগিতামূলক সেবার ক্ষতিপূরণে ব্যবহার না করে, তার জন্য আলাদা হিসাব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমে কঠোর জরিমানা
বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ডাক, কুরিয়ার বা পার্সেল ব্যবসা পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ প্রশাসনিক জরিমানা পূর্বের ৫০ হাজার টাকা (বা পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা) থেকে বাড়িয়ে অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল ডাকটিকিট ও ই-সেবার প্রবর্তন
প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি 'ডিজিটাল ডাকটিকিট বা ই-স্ট্যাম্পিং' চালু করা হয়েছে। গ্রাহক অনলাইনে বিল পরিশোধ করে সুরক্ষিত ডিজিটাল কিউআর কোড বা বারকোড পাবেন, যা স্বতন্ত্র ছাপানো মাধ্যম বা যেকোনো ডিভাইসে প্রদর্শিত হলেও বৈধ ডাকটিকিটের সমতুল্য আইনি স্বীকৃতি পাবে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বাধ্যতামূলককরণ
নতুন আইনে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর সকল নীতি ও অধিকার প্রযোজ্য করা হয়েছে। অপারেটরদের গ্রাহকের তথ্য শুধু সেবা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও, সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন এনক্রিপশন) গ্রহণের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। সকল বাণিজ্যিক অপারেটরদের জন্য একটি ডিজিটাল সেন্ট্রাল লজিস্টিকস ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম (CLTP) পরিচালনা এবং আন্তঃপরিচালন (Interoperability) নিশ্চিতকরণের বিধান করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা সহজে ই-কমার্সের ট্র্যাকিং তথ্য পেতে পারেন।
জরুরি সেবা ও জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে ডাকসেবার স্বীকৃতি
ডেজিগনেটেড অপারেটর কর্তৃক পরিচালিত ডাকসেবাকে জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হওয়ায় জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই মর্যাদার কারণে জাতীয় সংকটকালে ডাক, যানবাহন এবং আবশ্যিক জনবল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক চলাচল ও প্রবেশাধিকার সুবিধা লাভ করবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ ডাকের নেটওয়ার্ককে একটি অপরিহার্য ন্যাশনাল ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ডাকের আর্থিক সেবায় নতুন দিগন্ত
নতুন আইন অনুযায়ী, ডাক জীবন বিমা এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক এখন "অধিকারী ডাকসেবা" হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। ডাক জীবন বিমার প্রতিটি পলিসি এখন বাংলাদেশ সরকারের সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি সহকারে পরিচালিত হবে। একইভাবে, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সকল আর্থিক সেবার সঞ্চিত অর্থ এখন সরকারি কোষাগারে জমা থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে ব্যবহৃত হবে, যা সঞ্চয়কে আরও সুরক্ষিত ও লাভজনক করবে।
আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা ও কেওয়াইসি (KYC) যাচাইকরণ
জলবায়ু পরিবর্তন বা মাইগ্রেশনজনিত কারণে ঠিকানা হারানোর প্রেক্ষিতে (যেমন: চর বিলীন হওয়া ও জেগে ওঠা) পুনরায় যথাযথভাবে ঠিকানা চিহ্নিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য নাগরিকের ঠিকানাগুলোকে ডিজিটাল আর্কাইভ করা হবে। এরিয়া কোড, স্ট্রিট কোড, হাউজ কোডভিত্তিক ডিজিটাল ঠিকানা এবং তার জিও ফেন্সিংয়ের কথা অধ্যাদেশে বলা হয়েছে। এছাড়াও, ডাক ও পার্সেল সেবার অপব্যবহার রোধে, বিশেষত বিদেশগামী বা উচ্চমূল্যের অভ্যন্তরীণ চালানের ক্ষেত্রে, প্রেরক ও প্রাপকের সরকারি শনাক্তকরণ দলিল (জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট) পরীক্ষার মাধ্যমে কেওয়াইসি যাচাইকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।