আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোটা দেশ এখন এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের আওতায়। সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা ফেরাতে এবং ভোটের দিন শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাজপথে সক্রিয় হয়েছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রেখে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদ পর্যন্ত চলছে বিশেষ মহড়া, প্যারেড এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আর কঠোর সতর্কতায় ভোটকেন্দ্রগুলোকে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে প্রস্তুত ‘Security Grid’।
নৌবাহিনী প্রধানের পরিদর্শন ও দেশপ্রেমের ডাক
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বরগুনায় মোতায়েনকৃত নৌবাহিনীর বিশেষ ‘Contingent’ পরিদর্শন করেছেন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান। এ সময় তিনি নৌ-সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং নির্বাচনের দিন পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। নৌবাহিনী প্রধান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌবাহিনীর বর্তমান প্রস্তুতি অত্যন্ত সুসংহত এবং তারা সফলভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম।
সাতক্ষীরায় সেনাবাহিনীর ড্রোন মহড়া ও ডিজিটাল নজরদারি
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সেনা ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশেষ ‘Tactical Drill’। অত্যন্ত নিপুণ ও দ্রুত গতিতে কীভাবে ভোটকেন্দ্রের গোলযোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, চৌকস সেনাসদস্যরা তার প্রদর্শনী করেন। এবারের নির্বাচনে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে থাকছে ‘High-Tech Monitoring’। সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারির জন্য ‘Drone’ এবং দায়িত্বরত সদস্যদের শরীরে ‘Body Worn Camera’ ব্যবহার করা হবে। এতে করে মাঠপর্যায়ের প্রতিটি পরিস্থিতির লাইভ আপডেট (Real-time Monitoring) কন্ট্রোল রুমে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
পার্বত্য সীমান্তে বিজিবির কঠোর সতর্কতা
ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাঙামাটির কাপ্তাই এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা এবং নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি গ্রহণ করেছে ‘Zero Tolerance’ নীতি। মাদক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অস্ত্রপাচার ঠেকাতে দুর্গম পাহাড়ী পথে চলছে বিশেষ টহল। টহলে অত্যাধুনিক ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি সন্দেহজনক যানবাহন তল্লাশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। বিজিবির এই কঠোর অবস্থান মূলত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ভোটের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার একটি কৌশল।
আনসারের ‘ডিজিটাল অ্যাপ’ ও বিশাল মোতায়েন
নির্বাচনী নিরাপত্তায় অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জেলার আটটি আসনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অন্যদিকে, নোয়াখালীতে মোতায়েনকৃত আনসার সদস্যদের প্যারেড পরিদর্শন করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনুর রশিদ।
তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে ভোটের দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক রিপোর্টিংয়ের জন্য আনসার সদস্যরা বিশেষ ‘Digital App’ ব্যবহার করবেন। উল্লেখ্য, কেবল নোয়াখালী জেলাতেই ৮৭৫টি কেন্দ্রের জন্য ১১ হাজার ৩৭৫ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যা কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে।
ভোটারদের আস্থা ফেরাতে যৌথ বাহিনীর ‘Confidence Building’ টহল
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে যৌথ বাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চ (Flag March)। সাধারণ ভোটাররা যেন কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা প্রেশার (External Pressure) ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই টহলের মূল লক্ষ্য। সেনাবাহিনী ও পুলিশের এই সম্মিলিত অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে একটি অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সব শক্তি এখন একই সুতোয় গাঁথা। প্রযুক্তি আর জনবল—উভয় ক্ষেত্রেই এবার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা হয়েছে।