ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ UEFA Champions League-এর এক রোমাঞ্চকর রাত কলঙ্কিত হলো বর্ণবাদের কালো ছায়ায়। লুজ স্টেডিয়ামে বেনফিকার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত এক গোল করার পর আবারও বর্ণবিদ্বেষের শিকার হলেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার ভিনিসিউস জুনিয়র। বেনফিকার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির বিরুদ্ধে ভিনিসিউসকে লক্ষ্য করে ‘মোনো’ (বানর) শব্দ ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাঠের উত্তাপ গড়িয়েছে ড্রেসিংরুম থেকে সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত, যেখানে বেনফিকা কোচ জোসে মরিনিয়োর অবস্থান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মাঠেই অ্যাকশন: কার্যকর হলো অ্যান্টি-রেসিজম প্রোটোকল ম্যাচের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই লুজ স্টেডিয়ামের কোণায় দেখা যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। গোল উদযাপনের সময় কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে নাচছিলেন ভিনিসিউস। ঠিক সেই মুহূর্তে বেনফিকার প্রেস্তিয়ান্নি জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে ভিনিসিউসের কানে কানে কিছু একটা বলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। তিনি সরাসরি রেফারি ফ্রান্সিস লেতেজিয়েরের কাছে গিয়ে অভিযোগ জানান। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রেফারি দ্রুত খেলা থামিয়ে দুই হাত ক্রস করে মাঠেই ‘Anti-Racism Protocol’ বা বর্ণবাদ বিরোধী বিশেষ সংকেত চালু করেন। এটি ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে গৃহীত একটি কঠোর পদক্ষেপ।
মরিনিয়োর বিতর্কিত বয়ান ও ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’-এর অভিযোগ ম্যাচ শেষে সব ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন বেনফিকার বর্তমান কোচ ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ জোসে মরিনিয়ো। তিনি ভিনিসিউসের অভিযোগকে সরাসরি সমর্থন না করে উল্টো তার গোল উদযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মরিনিয়োর দাবি, ভিনিসিউসের নাচ বেনফিকা সমর্থকদের উসকে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি তাকে বলেছি গোল করে নিজের জায়গায় ফিরে যেতে। ভিনিসিউস যেখানেই খেলে, সেখানেই কিছু না কিছু ঘটে।”
মরিনিয়ো বেনফিকার বর্ণবাদমুক্ত ইতিহাস তুলে ধরতে ক্লাব কিংবদন্তি ইউসেবিওর উদাহরণ টানেন। তবে তার এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ‘Victim Blaming’ বা আক্রান্ত ব্যক্তিকেই দোষারোপ করার শামিল বলে মনে করছেন।
সতীর্থদের গর্জন: প্রেস্তিয়ান্নির আজীবন নিষেধাজ্ঞার দাবি ভিনিসিউসের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন তার রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থরা। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এর নিন্দা জানিয়েছেন। এমবাপ্পের দাবি, প্রেস্তিয়ান্নি ওই বর্ণবাদী শব্দটি অন্তত পাঁচবার উচ্চারণ করেছেন। ক্ষুব্ধ এমবাপ্পে বলেন, “এই খেলোয়াড়ের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার আর কোনো যোগ্যতা নেই। এটি এখন UEFA-এর দায়িত্ব যে তারা কী ব্যবস্থা নেয়। ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে এমন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।”
ইংলিশ ডিফেন্ডার ট্রেন্ট আলেকজান্ডার আর্নল্ড এবং অধিনায়ক ফেদে ভালভার্দেও এই ঘটনাকে ফুটবল বিশ্বের জন্য ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ভালভার্দে বলেন, “মুখ ঢেকে কথা বলার অর্থই হলো আপনি ভুল কিছু বলছেন। এটি অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ।”
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া: মরিনিয়ো কি ভুল করলেন? মরিনিয়োর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ক্লারেন্স সিডর্ফ। Amazon Prime-এ এক আলোচনায় তিনি বলেন, “মরিনিয়ো আজ বড় ভুল করেছেন। কোনো অজুহাতে বা উসকানির দোহাই দিয়ে বর্ণবাদকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। ভিনিসিউস অনেক সহ্য করেছে, তাকে রক্ষা করার বদলে তার আচরণের ওপর দায় চাপানো দুর্ভাগ্যজনক।” সাবেক ইংল্যান্ড তারকা থিও ওয়ালকটও মনে করেন, মরিনিয়োর ওই রাতে ক্যামেরার সামনে না আসাই ভালো ছিল।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও আগামীর পথ ভিনিসিউস জুনিয়র দীর্ঘদিন ধরেই স্প্যানিশ লিগসহ বিশ্ব ফুটবলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি প্রেস্তিয়ান্নিকে ‘কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়ে লেখেন, যারা মুখ ঢেকে গালি দেয় তারা মূলত কাপুরুষ। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা ফুটবল দুনিয়ায় বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইকে আরও বেগবান করবে। এখন ফুটবল বিশ্বের নজর UEFA-এর ডিসিপ্লিনারি কমিটির দিকে; তারা প্রেস্তিয়ান্নি বা বেনফিকার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।