বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শপথ গ্রহণের রেশ কাটতে না কাটতেই তাকে পাকিস্তান সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় আগত দেশটির পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী আহসান ইকবাল এই আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। দুই নেতার মধ্যকার এই প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলিয়ে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শপথ অনুষ্ঠান থেকে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক: কূটনৈতিক উষ্ণতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের প্রতিনিধিত্ব করতে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন আহসান ইকবাল। অনুষ্ঠান শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হন এবং নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের জন্য তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। বৈঠকে উভয় নেতা দুই দেশের মধ্যকার Bilateral Relations বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। এসময় পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে তারেক রহমানকে পাকিস্তান সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান আহসান ইকবাল।
সার্ক পুনরুজ্জীবন ও ভূ-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা SAARC-কে পুনরুজ্জীবিত করা। আহসান ইকবাল দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সমন্বিত Geo-economic vision বা ভূ-অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আঞ্চলিক সংযোগ (Regional Connectivity) উন্নত করতে সার্কের সক্রিয়তা অপরিহার্য। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সদিচ্ছা দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিনের স্থবির হয়ে থাকা কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে পারে।
‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ ও শিক্ষা খাত শিক্ষা ও গবেষণায় পারস্পরিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে আহসান ইকবাল ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ (Pakistan-Bangladesh Knowledge Corridor) তৈরির এক যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেন। এই উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের উচ্চশিক্ষা কমিশন (HEC) ‘Twin-university’ চুক্তির মাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানি মন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতোমধ্যে ৫০০টি বৃত্তি (Scholarships) বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ জন শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে তাদের উচ্চশিক্ষা শুরু করেছেন।
ডিজিটাল গভর্নেন্স ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশ একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বৈঠকে পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরো (PBS) এবং পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডাটাবেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি (NADRA)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। মূলত ডাটা সিস্টেম, Digital Governance এবং Capacity Building বা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিজেদের দক্ষতা ভাগাভাগি করতে চায় উভয় পক্ষ।
আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার অঙ্গীকার বৈঠকের সমাপ্তিতে উভয় নেতা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধির জন্য একসাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকারের এই পথচলা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে শক্তি ও বাণিজ্যের নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের খোলামেলা আলোচনা দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সূত্র: জিও নিউজ