• দেশজুড়ে
  • শঙ্খ নদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর উত্তোলন, সেই পাথরেই হচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণ, প্রকৌশলীর চোখের আড়ালে নাকি ‘সমঝোতা’

শঙ্খ নদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর উত্তোলন, সেই পাথরেই হচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণ, প্রকৌশলীর চোখের আড়ালে নাকি ‘সমঝোতা’

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
শঙ্খ নদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর উত্তোলন, সেই পাথরেই হচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণ, প্রকৌশলীর চোখের আড়ালে নাকি ‘সমঝোতা’

অসীম রায় (অশ্বিনী) বান্দরবান

চ্ছ স্রোত আর বিশাল পাথরময় সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত শঙ্খ নদী এখন রাতের বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত। গভীর রাতে বারুদ ফাটিয়ে নদীর বুক চিরে তোলা হচ্ছে পাথর—আর সেই পাথরই যাচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণকাজে।

রাতের আঁধারে বারুদ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং বিভিন্ন ক্রাশার মেশিনের মাধ্যমে এসব পাথর ভেঙে কংক্রিটে পরিণত করা হয়।

স্বচ্ছ স্রোত আর বিশাল পাথরময় সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত শঙ্খ নদী এখন রাতের বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত। গভীর রাতে বারুদ ফাটিয়ে নদীর বুক চিরে তোলা হচ্ছে পাথর—আর সেই পাথরই যাচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণকাজে।

থানচি উপজেলার তিন্দু বাজার এলাকায় মাসের পর মাস ধরে চলা এ কার্যক্রমে প্রশ্ন উঠেছে উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে। পরিবেশ ধ্বংস, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে ঝুঁকি এবং পর্যটন সম্ভাবনা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বলছেন, ‘উন্নয়নের নামে এ কেমন অনিয়ম?’

রাতে উত্তোলন, দিনে পরিবহন সরেজমিনে দেখা যায়, তিন্দু বাজারমুখী বিজিবি চেকপোস্টসংলগ্ন নদীপাড়ে বড় আকারের পাথর ভাঙার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা জানান, গত ডিসেম্বর থেকে গভীর রাতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাতেই পাথর ভেঙে ছোট করা হয়, পরে ক্রাশার মেশিনে গুঁড়ো করে দিনের বেলায় নির্মাণস্থলে নেওয়া হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রায় প্রতিরাতেই শব্দ হয়। সকালে গিয়ে দেখি পাথর উধাও।

সরকারি প্রকল্পেই ব্যবহার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তোলিত পাথর তিন্দু মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় ভবন, একটি বৌদ্ধ বিহার এবং তিন্দু বাজারের ‘বাজার সেট’ নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে।

২০২২–২৩ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের কাজ পায় ‘আগমা এন্টারপ্রাইজ’।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুইশৈথুই মারমা রনি। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়।

‘সমঝোতা’ করেই শুরু কাজ? তিন্দু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়ান বলেন, ভবন না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছিল। ঠিকাদারও দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ রেখেছিলেন। পরে ঠিকাদার ও সাইট তদারকি প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় পাথর ও বালি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কাজ পুনরায় শুরু হয়।

প্রধান শিক্ষকের এই বক্তব্য ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখা ঠিকাদার পরে দ্রুত কাজ শেষ করতে স্থানীয়ভাবে পাথর উত্তোলনের ‘শর্তে’ প্রশাসন বা সংশ্লিষ্টদের নীরব সম্মতি নিয়ে কাজে নেমেছেন। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো লিখিত অনুমতির তথ্য মেলেনি।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাথর ও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় যুবলীগ নেতা শৈবাসিং মারমার দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের নির্দেশ ও অর্থায়নে তিনি শঙ্খ নদী থেকে পাথর ও বালি উত্তোলন করে সরবরাহ করছেন। রেমাক্রী বাজারের ছাত্রলীগ কর্মী হ্লাচিংমং মারমারও এতে অংশ রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশ ও পর্যটন ঝুঁকিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, শঙ্খ নদীর পাথরময় প্রাকৃতিক দৃশ্য তিন্দুর অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে, বর্ষায় ভাঙন বাড়তে পারে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়তে পারে। তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য বলেন, “নদীর যে চেহারা ছিল, তা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু এভাবে নয়।”

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইয়াছির আরফাত বলেন, তিন্দু পর্যন্ত সড়ক ও ভবন নির্মাণে ইটের কংক্রিট ব্যবহারের বিধান রয়েছে। স্থানীয় পাথর ব্যবহারের সুযোগ নেই। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, পাথর ও বালু উত্তোলন খনিজসম্পদসংক্রান্ত বিষয় হলেও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।

হস্তক্ষেপের দাবি স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নদীপাড় পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বান্দরবানের সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।