মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) বারুদের গন্ধ আরও তীব্র করে তুলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আমেরিকা ও ইজরায়েলকে এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের থাকতে পারে, কিন্তু সেই সংঘাত কীভাবে এবং কখন শেষ হবে—তা একমাত্র নির্ধারণ করবে তেহরান। রোববার (১ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের এই অটল অবস্থানের কথা বিশ্ববাসীকে জানান।
দুই দশকের শিক্ষা ও মার্কিন পরাজয়ের বিশ্লেষণ আব্বাস আরাঘচি তার পোস্টে গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, “আমাদের পূর্ব সীমান্তে আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়গুলো বিশ্লেষণ করার জন্য আমাদের হাতে দীর্ঘ ২০ বছর সময় ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিয়েছি এবং নিজেদের সামরিক কৌশলকে আধুনিকায়ন করেছি।” তার এই মন্তব্যে পরিষ্কার যে, আমেরিকা যেভাবে ভিয়েতনাম বা পরবর্তীকালে ইরাক-আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পর্যুদস্ত হয়েছিল, ইরান সেই একই ফাঁদ ইজরায়েল ও আমেরিকার জন্য তৈরি করে রেখেছে।
‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ ও তেহরানের সক্ষমতা ইরানের রাজধানীতে ইজরায়েলি বোমাবর্ষণ তেহরানের যুদ্ধ পরিচালনার দক্ষতাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি বলে দাবি করেন আরাঘচি। তিনি ইরানের বিশেষ সামরিক কৌশল ‘বিকেন্দ্রীভূত মোজাইক প্রতিরক্ষা’র (Decentralized Mosaic Defense) কথা উল্লেখ করেন। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রান্তিক ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। আরাঘচির মতে, এই বিশেষ কৌশলের কারণেই যুদ্ধের সমাপ্তি এবং গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি এখন ইরানের হাতে।
শান্তি আলোচনার অন্তরালে হামলা ও ইরানের জবাব মর্মান্তিক বিষয় হলো, ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যখন একটি পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা (Nuclear Talks) চলছিল এবং জেনেভায় উভয় পক্ষ ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির’ ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ঠিক তখনই গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে ইরানজুড়ে হামলা শুরু করে আমেরিকা ও ইজরায়েল। এই বিশ্বাসঘাতকতামূলক হামলার প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক টেবিলের বদলে রণক্ষেত্রকেই বেছে নিয়েছে ইরান।
মার্কিন ও ইজরায়েলি আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান ইতিমধ্যেই শুরু করেছে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’ (Operation True Promise 4)। এই অভিযানের আওতায় ইজরায়েলের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে (US Military Bases) ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (Missile and Drone Strikes) চালানো হচ্ছে।
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরাঘচির এই মন্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি ইরানের সামরিক সক্ষমতার প্রতি এক ধরনের আত্মবিশ্বাস। পারমাণবিক আলোচনার সম্ভাবনা প্রায় স্তিমিত হয়ে আসায় এবং পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের (All-out War) আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তেহরান যদি সত্যিই যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণের সক্ষমতা রাখে, তবে আসন্ন দিনগুলোতে মার্কিন ও ইজরায়েলি রণকৌশল এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।