বিশেষ করে বছরের দুই ঈদে স্বাভাবিকের চেয়ে ভাড়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
এছাড়াও বিশেষ বিশেষ দিনে অর্থাৎ, যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ দেখা দিলেই বেড়ে যায় ভাড়ার পরিমাণ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হন মাদারীপুরের শিবচর ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকার যাত্রীরা। ভাঙ্গা থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি, গুলিস্তান রুটে সাধারণত লোকাল পরিবহন চলাচল করে। দীর্ঘদিন ধরেই শিবচরের পাঁচ্চ থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ২শ টাকা।
তবে এবার স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে ভাড়া কমিয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ভাঙ্গা ও শিবচর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী রাজধানী ঢাকা যাওয়া-আসা করেন। ভাঙ্গা থেকে ছেড়ে আসা লোকাল পরিবহনগুলো এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী নিয়ে থাকে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি, গুলিস্তান পর্যন্ত যাত্রী প্রতি ২শ টাকা ভাড়া।
একই ভাড়া ৮/১০ কিলোমিটার পরে এসে শিবচরের সূর্যনগর, পাঁচ্চর থেকেও নেওয়া হতো এতোদিন। বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাসের চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বাগ-বিতণ্ডা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এদিকে এক্সপ্রেসওয়ের সূর্যনগর, পাঁচ্চরসহ বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী নিলেই বাস সংশ্লিষ্টদের দিতে হয় ২০ টাকা হারে চাঁদা! স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই চাঁদা আদায় করা হত। ফলে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিয়েই ঢাকা যেতে হত। ঈদ মৌসুমে এই ভাড়ার পরিমাণ বেড়ে দুই থেকে তিন গুণ হয়।
তখন চাঁদার পরিমাণও বাড়ে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঁচ্চর এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, মূলত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পক্ষ হয়েই এই স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা আদায় হয়। তবে সম্প্রতি নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে বাসের ভাড়া কমানো হয়েছে। তবে এখনও চাঁদা উত্তোলন করা হয়। ঢাকার উদ্দেশ্যে আসা বিভিন্ন বাস থেকে যাত্রী প্রতি এই চাঁদা আদায় করে একটি চক্র। তবে আগের চেয়ে এদের তৎপরতা কমেছে।
যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আগে পাঁচ্চর থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ২শত টাকা। বর্তমানে ১৭০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এখানে ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঢাকাগামী লোকাল পরিবহনের এক চালক জানান, তেলের দাম, ব্রিজের টোল তো কমেনি। অথচ যাত্রীদের ভাড়া কমানো হয়েছে। তাছাড়া রাস্তায় চলতে গেলে কোনো না কোনোভাবে চাঁদা দিতেই হয়। কম আর বেশি। সব মিলিয়ে এখন যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে আমাদের কষ্টই। তাছাড়া সব সময় যাত্রী বেশি হয় না। অনেক যাত্রী বেশি টাকা দিয়ে পরিবহনে চলে যায়।'
মো. শান্ত নামে এক যাত্রী বলেন, এখন ভাড়া কিছুটা কমানো হয়েছে। আমাদের নতুন এমপি বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি বাসস্ট্যান্ডে বেশ কয়েকবার এসেছেন। এখন ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ঈদের সময় বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা ঠেকানো বেশ চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে বলে মনে হয়। ঢাকা থেকে বেশি ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় সব সময়। তাছাড়া যাত্রীদের চাপ বাড়লে পরিবহনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেও বাড়তি ভাড়া নিতে পারে। বিগত সময়েও এরকমটা হয়েছে। তাছাড়া, প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যথায় কঠিন!'
আরেক যাত্রী মো. সুলাইমান বলেন, কদিন ধরে ভাড়ার পরিমাণ ত্রিশ টাকা কমানো হয়েছে। এটা লোকাল পরিবহনের ভাড়া। দূরপাল্লার পরিবহনে ২শ টাকাই নেয়। তবে ঈদের সময় এই ধারা কতটুকু বজায় থাকে এটাই দেখার বিষয়। কারণ, বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এজন্য যাত্রীরা তেমন কিছু বলতে পারে না। এখন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ থাকলে বাড়তি ভাড়ার বিড়ম্বনা কমবে।
এদিকে দুর্ঘটনা এড়ানোসহ মহাসড়কে যেকোন বিশৃঙ্খলা রোধে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহুরুল ইসলাম।
তিনি জানান, ঈদে যাত্রীসেবা নিশ্চিতে বাড়তি টহল থাকবে। তাছাড়া দুর্ঘটনা রোধে গতি নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক পুলিশের তৎপরতা রয়েছে।
মাদারীপুর ১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা জানান, শিবচর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাওয়া যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরেই জুলুমের শিকার হচ্ছেন। মহাসড়কের সূর্যনগর ও পাঁচ্চর এলাকায় পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয় যাত্রীদের। আমরা চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। সব বাসের চালকদের বলে দেওয়া হয়েছে, স্ট্যান্ডে কোনো চাঁদা তারা দেবেন না। আর যাত্রীভাড়ার পরিমাণও বাস-মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে কমানো হয়েছে।
ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে। দূরপাল্লার পরিবহনের পাশাপাশি লোকাল পরিবহনেও ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় দ্বিগুণ। বাড়ি ফেরার তাড়া অথবা ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার ব্যস্ততা উভয় কারণেই যানবাহনে থাকে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। আর এই ভিড়কে পুঁজি করেই পরিবহনে বাড়ানো হয় ভাড়ার পরিমাণ। ঈদে দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিতে হয়-এমনটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। শিবচর থেকে ঢাকার বাস ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে তালিকা টাঙানো হয়েছে পাঁচ্চর গোলচত্বরে। তবে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া ঈদে বাড়তি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সাধারণ যাত্রীরা।