মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের গভীর সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করলেন তেহরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি (NBC)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা কোনো গোপন বিষয় নয় এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী এক ‘Strategic Partnership’-এর অংশ।
সামরিক অংশীদারত্ব নিয়ে আরাঘচির দৃঢ় অবস্থান
সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো ধরনের বিশেষ সহায়তা পাচ্ছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের সঙ্গে রাশিয়ার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে। এই দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা নতুন কিছু নয়। এটি অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এটি কোনো লুকোচুরি করার বিষয় নয়।”
তবে রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেতে নির্দিষ্ট কোনো ‘Data’ বা গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আরাঘচি কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নেন। তিনি জানান, তাঁর কাছে বিস্তারিত কোনো সামরিক উপাত্ত নেই, তবে দুই দেশের মধ্যকার বন্ধন যে অত্যন্ত শক্তিশালী তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই।
মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের চাঞ্চল্যকর দাবি
আব্বাস আরাঘচির এই বক্তব্যের ঠিক আগেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে তেহরান-মস্কো সখ্যতা নিয়ে বেশ কিছু গোপনীয় তথ্য ফাঁস করা হয়। সিবিএস নিউজ (CBS News) একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান ও গতিবিধি সংক্রান্ত স্পর্শকাতর ‘Intelligence’ বা গোয়েন্দা তথ্য ইরানের কাছে সরবরাহ করছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের (Washington Post) এক প্রতিবেদনে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, সামরিক বিমান এবং রাডার সিস্টেমের (Radar Systems) সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছে মস্কো। এই গোয়েন্দা সহায়তা ব্যবহারের ফলে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে নিখুঁত হামলা চালানো তেহরানের জন্য সহজতর হচ্ছে।
পরোক্ষ যুদ্ধে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ না নিলেও এ ধরনের তথ্য আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে তারা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। মস্কোর এই তথ্য সরবরাহ মূলত মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের হাতকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত চাল (Geopolitical Move)। তবে ওয়াশিংটনের এই অভিযোগ বা প্রতিবেদনগুলো নিয়ে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ
আব্বাস আরাঘচির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা জোরদার করেছে। তেহরান মনে করে, রাশিয়ার মতো বিশ্বশক্তির সঙ্গে তাদের এই সামরিক সংযোগ ওয়াশিংটনের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদান থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই এই দুই দেশের ‘Strategic Alliance’ আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন কোনো দিকে মোড় দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।