চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুরের আলী নগরে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িতরা ‘অবজারভেশন টাওয়ার’ ও ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রাখত বলে জানিয়েছেন পুলিশের চট্টগ্রামের রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শ (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ।
সীতাকুণ্ড থানা এলাকার ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ জঙ্গল ছলিমপুরে অপরাধীদের ধরতে সোমবার অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী।
মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্য দেন ডিআইজি।
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানে একটি বিদেশি ও একটি দেশি পিস্তল, একটি এলজি, ২৭টি পাইপগান, পিস্তলের ৩০টি খালি ম্যাগাজিন, ৬১টি কার্তুজ, বিভিন্ন ধরনের ১১৬৪ রাউন্ড গুলি, ১১টি ককটেল, পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে আহসান হাবিব বলেন, “আলীনগর এলাকায় সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে এবং অবজারভেশন টাওয়ারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত সন্ত্রাসীরা।”
সেখান থেকে ১৯টি সিসি ক্যামেরা, তিনটি ডিভিআর, পাওয়ার বক্স এবং দুইটি বাইনোকুলার বা দূরবীন উদ্ধার করা হয়েছে, ভেঙে দেওয়া হয়েছে অপরাধীদের ব্যবহৃত টাওয়ারগুলো, বলেন ডিআইজি।
জঙ্গল ছলিমপুরে বিশেষ এই অভিযানে ছিলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএনসহ যৌথ বাহিনীর মোট ৩১৮৩ সদস্য এবং সাতজন ম্যাজিস্ট্রেট।
দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় অভিযানে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি (আর্মার্ড পারসোনাল ক্যারিয়ার), র্যাব ও চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
ডিআইজি জানান, জঙ্গল ছলিমপুরের ছিন্নমূল ও আলী নগর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাব ও পুলিশের দুইটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
আপাততত দুইটি ক্যাম্প স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনে আরও ক্যাম্প স্থাপন করার কথা বলেছেন তিনি।
দুর্গম পাহাড়ি ওই এলাকায় গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর সদস্য নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।
নিহতের জানাজায় এসে র্যাবপ্রধান এ কে এম শহীদুর রহমান জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর প্রায় দেড় মাস পর সোমবার হল সেই অভিযান।
জঙ্গল ছলিমপুরের দুই অংশ- ছিন্নমূল ও আলী নগর। এরমধ্যে ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ রোকন উদ্দিন ও তার অনুসারীদের হাতে এবং আলী নগরের নিয়ন্ত্রণ মোহাম্মদ ইয়াছিন ও তার অনুসারীদের হাতে।
সোমবারের অভিযানেও অধরা এই দুই পক্ষের নেতৃত্বদানকারী ও তাদের অনুসারীরা।
তবে পরবর্তীতে সেখানে সফলতা আরও বাড়বে বলেছেন রেঞ্জ ডিআইজি পলাশ।
তিনি বলেন, “সেখানে আমাদের কমিউনিকেশন স্টাবলিশ করতে পেরেছি। আমাদের আশা আগে যে সমস্ত সন্ত্রাসী অপরাধ করে সেখালে লুকিয়ে থাকার প্রবণতা ছিল সেটা এখন আর করতে পারবে না।”
গ্রেপ্তার ২২ জন অস্ত্র ও হত্যা মামলায় আসামি
মঙ্গলবার বিকালে সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, র্যাব সদস্য হত্যা মামলায় এজাহার নাম থাকা আসামির বাইরে বেশকিছু অজ্ঞাতনামা আসামি ছিল। গ্রেপ্তার হওয়াদের সে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
“আর সোমবারের অভিযানে উদ্ধার হওয়া গুলি ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় এক নারীসহ গ্রেপ্তার ২২ জনকে এবং অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।”
প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জঙ্গল ছলিমপুরের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই জনপদ নিয়ন্ত্রণ করা হয় স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে।
সেখানকার বাসিন্দারা ছাড়া অন্যরা প্রবেশ করতে গেলে বাধার মুখে পড়েন। অতীতে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে হামলার শিকারও হয়েছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সমিতির সদস্যপদ নিতে হয় টাকার বিনিময়ে। পরে সমিতিকে টাকা দিয়ে পাহাড়ের ভেতরে একেক খণ্ড জমির দখল নিয়ে ঘর তোলা হয়। ঘর তুলতেও নিয়ন্ত্রকদের টাকা দিতে হয়।
২০১০ সালে গিয়েও ওই এলাকায় নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রহরা পেরিয়ে ঢুকতে হয়েছিল। এবার দেখা গেল, এলাকার নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হচ্ছে সিসি ক্যামেরা।
২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল ছলিমপুরের আলীনগর এলাকায় মোহাম্মদ ইয়াছিন ও রোকন-গফুর ‘বাহিনীর’ মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হয় বেশ কয়েকজন।