• দেশজুড়ে
  • বিপন্ন ‘অলিভ রিডলি’র নিথর দেহ সৈকতে: কুয়াকাটা উপকূলে কেন বাড়ছে সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃত্যু?

বিপন্ন ‘অলিভ রিডলি’র নিথর দেহ সৈকতে: কুয়াকাটা উপকূলে কেন বাড়ছে সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃত্যু?

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বিপন্ন ‘অলিভ রিডলি’র নিথর দেহ সৈকতে: কুয়াকাটা উপকূলে কেন বাড়ছে সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃত্যু?

বিরল প্রজাতির ৩৫ কেজি ওজনের পুরুষ কচ্ছপ উদ্ধার; জালে আটকা পড়া না কি পরিবেশ বিপর্যয়—বিপন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর অকাল মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে আবারও ভেসে এলো বিপন্ন প্রজাতির একটি বিশালাকার মৃত কচ্ছপ। দীর্ঘদিন পর উপকূলে এত বড় আকৃতির সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা মেলায় পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি পরিবেশবাদীদের মধ্যে দানা বাঁধছে গভীর শঙ্কা। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে সৈকতের পশ্চিম পাশে ‘হোটেল সি ভিউ’ সংলগ্ন এলাকায় কচ্ছপটির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

বিশালাকার ‘অলিভ রিডলি’র দেখা মিলল সৈকতে প্রত্যক্ষদর্শী ও উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন ‘উপারা’র সদস্যরা জানান, দুপুর ২টার দিকে জোয়ারের পানিতে কচ্ছপটি ভেসে আসে। উদ্ধারকৃত কচ্ছপটির ওজন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি। চলতি বছরে কুয়াকাটা উপকূলে ভেসে আসা কচ্ছপগুলোর মধ্যে এটিই আকারে সবচেয়ে বড়। স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে বন বিভাগ ও পরিবেশকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

বিপন্ন প্রজাতির এই কচ্ছপটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (BBCEF)-এর তথ্যমতে, উদ্ধারকৃত কচ্ছপটি মূলত ‘অলিভ রিডলি’ (Olive Ridley) প্রজাতির, যার বৈজ্ঞানিক নাম Lepidochelys olivacea। এটি একটি পুরুষ কচ্ছপ এবং বিশ্বজুড়ে এটি বিপন্ন বা ‘Endangered Species’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বা Marine Biodiversity রক্ষায় এই কচ্ছপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্রের তলদেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে এদের অবদান অনস্বীকার্য।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঘনীভূত রহস্য কুয়াকাটা উপকূলে প্রায়ই মৃত কচ্ছপ ভেসে আসার বিষয়টি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কচ্ছপের শরীরে গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। অনেক সময় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলারের শক্তিশালী জালে (Trawl nets) প্যাঁচানো অবস্থায় এদের পাওয়া যায়। মাছ ধরার সরঞ্জামের আঘাত অথবা জালে আটকা পড়ে অক্সিজেনের অভাবে এদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বা সমুদ্রের পানির দূষণও এর পেছনে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও প্রশাসনের তৎপরতা কুয়াকাটা উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (UPARA) যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, “বারবার বিরল প্রজাতির কচ্ছপের মৃত্যু সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য এক অশনিসংকেত। কচ্ছপ সমুদ্রের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে। এদের রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।”

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ইয়াসিন সাদেক জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং পরিবেশ দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, কচ্ছপটি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়। একই সাথে জেলেদের সচেতন করতে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বন বিভাগ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার কুয়াকাটা সৈকতের এই ‘অলিভ রিডলি’র মৃত্যু আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য কতটা হুমকির মুখে। কেবল সচেতনতা নয়, বরং সমুদ্রের নিষিদ্ধ এলাকায় অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণই পারে এই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করতে।

Tags: endangered species wildlife conservation forest department marine biodiversity patuakhali news kuakata beach sea turtle dead turtle olive ridley