• জাতীয়
  • বাবাকে খুঁজে ফেরে অসহায় সন্তানরা

বাবাকে খুঁজে ফেরে অসহায় সন্তানরা

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
বাবাকে খুঁজে ফেরে অসহায় সন্তানরা

প্রতিদিনের মতোই দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন গুম হওয়া প্রিয়জনদের অসহায় স্বজনরা। হয়তো একদিন ফিরে আসবেন পরিবারের সেই মানুষটি—এই আশাতেই কেটে যাচ্ছে বছর পর বছর।

কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো, বহু নেতাকর্মী এখনো নিখোঁজ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের অনেকেরই আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি।

বিগত সরকারের সময়ে গুমের অভিযোগে নিখোঁজ হওয়া এসব মানুষের পরিবার এখনো প্রিয়জনের সন্ধান ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। অনেক স্বজনই জানেন না তাদের প্রিয় মানুষটি আদৌ বেঁচে আছেন কিনা, নাকি কোনো অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছেন চিরতরে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে অন্তত ৭২১ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৮ জন এখনো নিখোঁজ।

যাদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন পর ফিরে এলেও তাদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। এদিকে তৎকালীন সরকার গুমের অভিযোগ অস্বীকার করায় ২০১৭ সালে বিএনপি ঢাকাকেন্দ্রিক ২৫ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল।

দলটির দাবি, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিএনপির এক হাজারের বেশি নেতাকর্মী গুম হয়েছেন। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।

গুম হওয়া পরিবারের স্বজনরা

বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে গুমের প্রথম দিকের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ চৌধুরী আলমের নিখোঁজ হওয়া।

২০১০ সালের ২৫ জুন রাতে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড থেকে সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার গাড়িচালককে মারধর করে গাড়িটিও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

চৌধুরী আলমের ছোট ছেলে শাওন চৌধুরী বলেন, বাবাকে হারানোর শোকে মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। বাবাকে হারিয়ে আমরা পুরো পরিবারটাই যেন ভেঙে পড়েছি। সুখ নামের জিনিসটা আমাদের জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে গাড়িসহ নিখোঁজ হন বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী। তার সঙ্গে গাড়িচালক আনসার আলীকেও তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরদিন তার ব্যবহৃত গাড়িটি বনানীর একটি সড়কের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও হরতাল হয়, সহিংসতায় নিহত হন অন্তত সাতজন।

সিলেটের জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সাবেক নেতা আব্দুল মালেক বলেন, টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলনের সময় ইলিয়াস আলীর ডাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। এরপর থেকেই তিনি ক্ষমতাসীনদের চোখের কাঁটা হয়ে ওঠেন।

তিনি দাবি করেন, পরে বিভিন্ন সূত্রে শুনেছেন ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

এখনো তার মা সূর্য বানু বিবি প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আশা করেন, হয়তো একদিন ছেলে ফিরে এসে আবার ‘মা’ বলে ডাকবে।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন। পরিবারের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।

তার মেয়ে হাফসা ইসলাম রাইতা বলেন, আমার বাবার সঙ্গে আমাকেও যদি গুম করা হতো, তাহলে অন্তত তাকে সামনে থেকে দেখতে পারতাম, ছুঁয়ে আদর করতে পারতাম। এত কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো না। কত বছর হয়ে গেল, বাবা বলে ডাকতে পারছি না।

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ এলাকা থেকে নিখোঁজ হন পারভেজ হোসেন। তার মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃদি বলেন, প্রায় ১৩ বছর হয়ে গেল বাবাকে খুঁজছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম বাবা হয়তো ফিরে আসবেন। অনেকের বাবা ফিরেছেন, কিন্তু আমার বাবা এখনো আসেননি।

একই দিনে নিখোঁজ হন ছাত্রদল নেতা চঞ্চল। তার স্ত্রী রেশমা আক্তার জানান, চঞ্চল গুম হওয়ার সময় তাদের ছেলে আহাদের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। তখন সে সারাদিন ‘বাবা বাবা’ বলে খুঁজত। এখন সে কিশোর হয়েছে। বলে, বড় হয়ে বাবাকে খুঁজে বের করবে।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন কাওসার হোসেন। তার মেয়ে লামিয়া আক্তার মীমের বয়স তখন তিন বছর ছিল। এখন সে কিশোরী।

মীম বলে,বাবার আদর কী, আমি বুঝতে পারিনি। বাবাকে খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। বড় হয়ে পুলিশ হয়ে বাবাকে খুঁজে বের করব।

২০১৩ সালে নিখোঁজ হওয়া ছাত্রদল নেতা সেলিম রেজা পিন্টু, মাহফুজুর রহমান সোহেলসহ আরও অনেকের পরিবার এখনো অপেক্ষায় দিন গুনছে।

মাহফুজুর রহমান সোহেলের মেয়ে সাদিকা সরকার শাফা বলে, আমার বন্ধুদের বাবা আছে। তারা বাবার সঙ্গে ঘুরতে যায়, মজা করে। কিন্তু আমার বাবা নেই। বাবা ছাড়া সব সময় ভয় লাগে।

গুম তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

কমিশনের মতে, এসব গুমের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, কমিশন বিলুপ্ত হওয়ার পর এর সব নথি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে পাঠানো হয়েছে। গুম-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশ সংসদে পাস হবে কি না, বা পাস হলেও অপরিবর্তিত থাকবে কি না—তা জানা না থাকায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে এখনই কিছু বলা কঠিন।

তবে ভুক্তভোগী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অধ্যাদেশ দুটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাসের দাবি জানানো হয়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ জানায়, তাদের কাছে সারা দেশে অন্তত ৩৫০ জন গুম হওয়া ব্যক্তির তালিকা রয়েছে, যাদের মধ্যে ১৫৮ জন এখনো নিখোঁজ।

সংগঠনের সদস্য মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, আমরা শুধু জানতে চাই আমাদের সন্তান বা স্বজনরা কোথায়। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে—এই সত্যটা জানতে চাই।

তার ভাষায়, বছরের পর বছর ধরে এসব পরিবারের মানুষ ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক শিশু ট্রমা নিয়ে বড় হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাজীবনে।

তিনি জানান, নিখোঁজদের পরিবারের অনেকেই এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন। অনেক সন্তান বাবাকে ছাড়াই বড় হচ্ছে, অনেক স্ত্রীকে একাই সংসারের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, গুমের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা জরুরি। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে পারে এবং দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

আর স্বজনদের একটাই কথা—তারা শুধু জানতে চান, কেন তাদের প্রিয় মানুষগুলোকে কেড়ে নেওয়া হলো। এবং যারা দায়ী, তাদের যেন আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়।

Tags: বাবাকে খুঁজে অসহায় সন্তানরা