বিশ্বসংগীতের মানচিত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী কে-পপ (K-Pop) সেনসেশন বিটিএস (BTS) দীর্ঘ বিরতি শেষে ফিরছে তাদের চিরচেনা মঞ্চে। এই মহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এখন সাজ সাজ রব। একদিকে ভক্তদের গগনবিদারী উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিউল প্রশাসন নিয়েছে নজিরবিহীন ব্যবস্থা। উৎসবের আমেজ আর কড়া নিরাপত্তার এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে এখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে গোটা শহর।
গ্যাংওয়ামুনে জনসমুদ্রের হাতছানি: প্রস্তুতির তুঙ্গে সিউল
আগামী শনিবার (২১ মার্চ) স্থানীয় সময় রাত ৮টায় সিউলের ঐতিহাসিক গ্যাংওয়ামুন এলাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে 'বিটিএস দ্য কামব্যাক লাইভ আরিরাং' (BTS The Comeback Live Arirang)। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আয়োজিত এই কনসার্টে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ভক্তের সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু স্থানীয়রাই নন, প্রিয় ব্যান্ডের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন চাক্ষুষ করতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিউলে ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো 'আর্মি' (BTS Army)। বিশাল এই জনসমাগম সামাল দিতে সিউল মহানগর কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ বিভাগ কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশেষ রোডম্যাপ তৈরি করেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী সতর্কতা ও চার স্তরের নিরাপত্তা বলয়
বিটিএসের এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা প্রোটোকল (Security Protocol) জারি করেছে। বিশেষ করে জংনোগু এবং জংগু এলাকায় চার স্তরের সন্ত্রাসবিরোধী সতর্কতা (Counter-terrorism Alert) কার্যকর করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার করতে কনসার্ট ভেন্যু ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি ড্রোন এবং উন্নত প্রযুক্তির সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং চালানো হচ্ছে। সিউল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় একাধিক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
ডিজিটাল আঙিনায় বৈশ্বিক উৎসব: নেটফ্লিক্সে লাইভ স্ট্রিমিং
গ্যাংওয়ামুনের রাজপথে যারা সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারছেন না, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে এই অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে (Netflix) বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার বা গ্লোবাল স্ট্রিমিং (Global Streaming) করা হবে। এটি বিটিএসের ডিজিটাল উপস্থিতির ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হতে যাচ্ছে। এছাড়া সিউলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিশাল এল ই ডি (LED) স্ক্রিনের মাধ্যমে কনসার্টটি লাইভ সম্প্রচারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ নাগরিকরাও এই উৎসবের অংশীদার হতে পারেন।
সাংস্কৃতিক উৎসব ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিটিএসের এই কামব্যাক কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং এটি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিজয়। কনসার্ট উপলক্ষে সিউলজুড়ে আলোকসজ্জা, ভক্তদের জন্য বিশেষ ফ্যান-জোন এবং বিটিএস থিমযুক্ত ক্যাফে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই একটি ইভেন্টকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও রিটেইল খাতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগৃহীত হবে।
তবে এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উৎসবের চেয়েও সরকারের কাছে এখন মূল অগ্রাধিকার 'পাবলিক সেফটি' (Public Safety)। ভিড় নিয়ন্ত্রণ বা ক্রাউড ম্যানেজমেন্টের (Crowd Management) জন্য কনসার্ট এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ডাইভারশন এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের শিডিউল পরিবর্তন করা হয়েছে।
সিউল এখন কেবল একটি শহর নয়, বরং বিশ্বসংগীতের এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ। যেখানে সুরের উন্মাদনার পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে আছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।