মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতার মধ্যে ইরানের ক্ষমতার অন্যতম শীর্ষ স্তম্ভের পতন ঘটল। তেহরানের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে ইসরাইলি বাহিনীর এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খতিব। দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় এই 'Security Breach' বা নিরাপত্তা বিপর্যয়ের খবরটি নিশ্চিত করেছেন স্বয়ং ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন এক নতুন এবং অনিশ্চিত মোড় নিল।
তেহরানে রক্তক্ষরণ: যেভাবে নিহত হলেন ইসমাইল খতিব
গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ দাবি করেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসমাইল খতিবকে লক্ষ্য করে এই 'Targeted Killing' পরিচালনা করা হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর এক আবেগঘন বার্তায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খতিবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমার প্রিয় সহকর্মী ইসমাইল খতিব, আলি লারিজানি এবং আজিজ নাসিরজাদেহর পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীদের এই কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে।”
শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা: এক এক করে নিভছে প্রদীপ
ইরানের গোয়েন্দা প্রধানের এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক দিনে দেশটি তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একাধিক শীর্ষ ব্যক্তিকে হারিয়েছে। ইসমাইল খতিবের শাহাদাতের মাত্র একদিন আগেই নিহত হন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি এবং বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেমানি। এমনকি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসনের শুরুর দিকেই প্রাণ হারান দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ। এই ধারাবাহিক হামলার ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কাঠামো এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইসমাইল খতিব: খামেনির বিশ্বস্ত ও এক কট্টরপন্থী স্তম্ভ
২০২১ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হাত ধরে গোয়েন্দা মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ইসমাইল খতিব। রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর পর নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ক্ষমতায় এলেও খতিবকে তাঁর পদে বহাল রাখার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণত ইরানে ক্ষমতার পালাবদলে এই ধরনের সংবেদনশীল পদের পরিবর্তন ঘটে থাকলেও, খতিবের ওপর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অগাধ আস্থা থাকায় তিনি পদে টিকে ছিলেন। খতিবকে বিবেচনা করা হতো এক 'Hardliner' বা কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে, যিনি সংস্কারপন্থী পেজেশকিয়ানের তুলনামূলক নরম অবস্থানকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতেন।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গোয়েন্দা প্রধানের মৃত্যুতে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত’ হিসেবে অভিহিত করলেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একে ইসরাইলের ‘Intelligence Superiority’ বা গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। তেহরানের মতো সুরক্ষিত স্থানে ডুকে সরাসরি ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে হত্যা করার এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে বদলে দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি এই হত্যাকাণ্ডের জবাবে বড় ধরনের কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবে? নাকি এই বিশাল শূন্যতা পূরণে তারা তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় ধরনের সংস্কার আনবে? বিশ্ব রাজনীতি এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে।