পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যখন যুদ্ধংদেহী মনোভাব আর পাল্টাপাল্টি হুমকির টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় মোড় নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের বৈরিতা সরিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social)-এ দেওয়া বার্তার রেশ ধরে এবার সাংবাদিকদের সামনেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রধান প্রধান দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ঐকমত্য (Consensus) তৈরি হয়েছে।
ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের ঘোষণা: সমঝোতার নতুন সমীকরণ
স্থানীয় সময় সোমবার ফ্লোরিডার একটি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা জানান। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও জোরালো আলোচনা হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত ফলাফল কী দাঁড়ায় তা সময় বলবে, তবে আমরা প্রধান প্রধান ইস্যুতে একটি সাধারণ ঐকমত্যের ক্ষেত্রে পৌঁছাতে পেরেছি। মূলত প্রায় সব বিষয়েই আমরা একমত হতে পেরেছি বলে আমি মনে করি।”
ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, ইরান বর্তমানে একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং যুক্তরাষ্ট্রও একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এমনকি দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে পুনরায় টেলিফোনে আলাপ হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
হুমকি থেকে আলোচনায়: ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ও রণকৌশল বদল
ট্রাম্পের এই নমনীয় সুরের পেছনে রয়েছে গত কয়েকদিনের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতি (Geopolitics)। গত শনিবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরানকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে (Energy Infrastructure) ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। পাল্টা জবাবে ইরানও প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল।
তবে সোমবারের বক্তব্যে ট্রাম্পের সুরে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সমাধান (Comprehensive Settlement) নিয়ে আলোচনা চলছে এবং আপাতত ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া: স্বস্তির নিঃশ্বাস নাকি স্রেফ কৌশল?
ট্রাম্পের এই অবস্থান বদলকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)। ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এক বিবৃতিতে বলেন, অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ রাখা এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা কমাতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ব্রিটেন আপাতত ইরানের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো হামলার আশঙ্কা দেখছে না। তবে তিনি দ্রুত এই উত্তেজনা প্রশমন এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পর্দার অন্তরালে সামরিক রহস্য
কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে সামরিক অঙ্গনে একটি ঘটনা নিয়ে বেশ গুঞ্জন চলছে। গত সপ্তাহে একটি মার্কিন এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের একটি ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। কিছু ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, বিমানটি আকাশপথের লড়াইয়ে বা অন্য কোনো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও পেন্টাগন বা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই ‘ট্যাকটিক্যাল’ (Tactical) পরিস্থিতিও আলোচনাকে ত্বরান্বিত করে থাকতে পারে।
শুক্রবারের ডেডলাইন: তাকিয়ে আছে বিশ্ব
কাতার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল-ইতাইবি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাঁর মতে, ট্রাম্পের দাবি যদি সত্যি হয় এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা বা চুক্তি না আসে, তবে পরিস্থিতি পুনরায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
আপাতত বিশ্বরাজনীতির নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘ঐকমত্যের দাবি’ কি আসলেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন পথ দেখাবে, নাকি এটি কেবল একটি সাময়িক রণকৌশল (Strategic Move), তা স্পষ্ট হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।