গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি এ কে এম ফজলুল হক মিলন নির্বাচিত হওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপির নেতারা থানার দালালি, জমির দেন-দরবার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না।
মিলনের ওই ঘোষণার পর জেলার অন্য সংসদ সদস্যরাও একই ঘোষণা দিয়েছেন। এর পরও কেউ মানছে না নেতাদের কথা। জেলায় দেদারছে চলছে মাদকের কারবার, জমির দালালি, সালিসি দরবার, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড।
নামে-বেনামে অফিস খুলে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এ ধরনের কর্মকাণ্ড। সোমবার (২৩ মার্চ) কালীগঞ্জে মাদকের টাকার জন্য মাকে গলাটিপে হত্যা করে সন্তান- এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে জেলায় মাদকের ভয়াবহতার একটি চিত্র উঠে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় মাদকের পাইকারি বাজার টঙ্গী। টঙ্গীর ১৯টি বস্তি এখন মাদকের আখড়া।
অনেকটা প্রকাশ্যেই এখন মাদকের কারবার চলছে সেখানে। মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে নামে-বেনামে অফিস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি টানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত অফিস। এ ছাড়া বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিটের বাইরে নেতাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা বিলাসবহুল এমন অফিস সংশ্লিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণে মিনি থানার মতো কাজ করছে।
এসব অফিস থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমির দেন-দরবার ও ঝুট ব্যবসা। বেশির ভাগ অফিসে বাহারি আসবাবপত্রের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদের ছবি। গানের অফিস, ব্যবসার অফিস, আড্ডার অফিস নাম দিয়ে তা ব্যবহার করা হচ্ছে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায়।
সরেজমিনে একাধিক থানায় গিয়ে জানা যায়, থানাগুলোতে একটি করে বৈঠকখানা রয়েছে, যেখানে পুলিশ দুই পক্ষকে নিয়ে দেন-দরবার করেন। ফৌজদারি অপরাধের পাশাপাশি জায়গা-জমির দরবার, মাদকের ফয়সালা ও ঝুটসহ নানা বেআইনি বিষয়ে ফয়সালা করা হয় সেখানে।
সম্প্রতি দেখা যায়, কালীগঞ্জ থানার বৈঠকখানায় সালিসি দরবার করার ক্ষেত্রে একাধিক বিএনপি নেতা অংশ নেন। থানার বৈঠকখানায় বসে একাধিক নেতার সালিসি দরবার নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয়েছে। এ ধরনের অবস্থা জেলার সব থানায় চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। কোনো অভিযোগ হলে পক্ষে-বিপক্ষে বিএনপির নেতারা থানায় ভিড় করছেন। পুলিশও নেতাদের কথার বাইরে যেতে পারছে না।
এদিকে একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, টঙ্গী মাদকের পাইকারি বাজার। টঙ্গী থেকে ইয়াবা ও ফেনসিডিল রাজধানী ঢাকায় নিয়মিত প্রবেশ করছে। টঙ্গীর ১৯ বস্তি থেকে মাদক গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুরের বিভন্ন স্থানে যাচ্ছে।
সূত্র বলছে, ব্যক্তিগত অফিসের মাধ্যমে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে আনাচে কানাচে। এ নিয়ে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে ধরে ইয়াবা দিয়ে পুলিশে দিচ্ছে খোদ মাদক কারবারিরাই। আর পুলিশ মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় নিরপরাধ মানুষকেও মাদক জব্দ দেখিয়ে চালান দিচ্ছে মামলা দিয়ে। ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারি অভিযান তেমন চোখে পড়েনি।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা প্রায় সবাই বিএনপির পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। কেউ কেউ দলে যোগও দিয়েছে। যে দল যখন ক্ষমতায় আসে, অপরাধীচক্র তখন সেই দলের ছাতার নিচে জায়গা করে নেয়, টাকার বিনিময়ে। এতে দলীয় ত্যাগী নেতারা জায়গা না পেয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি এ কে এম ফজলুল হক মিলনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, থানায় কোনো সালিসি দরবার হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।