ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে আইনি কাঠামোয় রূপ দিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের (Ordinance) মধ্যে জুলাই বিপ্লব সংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সকল সদস্য পূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। বুধবার (২৫ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে আয়োজিত বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় দফার মুলতবি বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে এই ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান।
ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ ও ঐকমত্যের প্রতিফলন বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলের আইনি পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ‘জুলাই সনদ’ এবং দেশের বিদ্যমান সংবিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে প্রতিটি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করছি। এখন পর্যন্ত ১২০টি অধ্যাদেশের পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে জারি করা চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির কোনো সদস্যের দ্বিমত নেই। এটি একটি বড় অর্জন, যা বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে সংসদীয় রাজনীতিতে স্বীকৃতি দিচ্ছে।” অবশিষ্ট ১৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় বিস্তারিত আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশ থেকে স্থায়ী আইনের পথে: বর্তমান চিত্র ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই বিশেষ কমিটি গঠনের পর থেকেই শুরু হয়েছে আইনগত বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের কাজ। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান যখন ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেন, তখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল ছিল কোনগুলো স্থায়ী আইন (Permanent Legislation) হিসেবে বহাল থাকবে। সংসদীয় নিয়ম বা Constitutional Mandate অনুযায়ী, উত্থাপনের পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১৫ মার্চ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।
সংসদীয় প্রক্রিয়ার বাধ্যবাধকতা ও পরবর্তী পদক্ষেপ বুধবার দুপুর ২টায় শুরু হওয়া এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন। এর আগে মঙ্গলবারও (২৪ মার্চ) দীর্ঘ সময় ধরে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, আগামী ২৯ মার্চের বৈঠকে অবশিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আলোচনার পর একটি চূড়ান্ত সুপারিশ বা ‘Recommendation Report’ প্রণয়ন করা হবে। এই প্রতিবেদনটি পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশনে পেশ করা হবে এবং সেখানেই ভোটাভুটির মাধ্যমে এগুলো আইনে পরিণত হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের কাজগুলোর একটি শক্ত লেজিসলেটিভ ব্যাকআপ (Legislative Backup) নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
বৈঠকে উপস্থিত শীর্ষ নীতিনির্ধারকবৃন্দ সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এই বিশেষ কমিটিতে সরকারের প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রী ও সিনিয়র সংসদ সদস্যদের রাখা হয়েছে। বুধবারের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ ওসমান ফারুক। এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং জি এম নজরুল ইসলাম।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এই ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।