ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর এক করুণ আখ্যান উন্নত জীবনের স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন তারা। কিন্তু লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে পাড়ি জমানোর সেই স্বপ্ন এখন বিষাদে রূপ নিয়েছে। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে টানা সাত দিন খাদ্য ও পানীয় জলের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ১২ জন টগবগে যুবক। নিষ্ঠুরতার চরম সীমায় গিয়ে মানবপাচারকারীরা মৃতদেহগুলো দাফনের সুযোগটুকুও দেয়নি, বরং সাগরের গভীর জলেই ভাসিয়ে দিয়েছে তাদের নিথর দেহ।
নিহতদের পরিচয় ও শোকের মাতম সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার এই ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন— দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), সাজিদুর রহমান (২৮), সাহান এহিয়া (২৫); রাজানগর ইউনিয়নের মুজিবুর রহমান (৩৮); করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস। এ ছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের আবু ফাহিম; জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
নিহতদের বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। কারো সন্তান, কারো স্বামী, আবার কারো বাবা হারানোর শোকে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। গত জানুয়ারি মাসে বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তারা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখন চিরস্থায়ী বিচ্ছেদে পরিণত হয়েছে।
১২ লাখ টাকার বিনিময়ে অনিশ্চিত যাত্রা অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় মানবপাচারকারী (Human Trafficking) চক্রের সদস্য মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে জনপ্রতি ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে পা বাড়ান। দালাল চক্রের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বড় জাহাজে করে নিরাপদ 'Migration'-এর। কিন্তু বাস্তবে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে। লিবিয়ার উপকূলে পৌঁছানোর পর তাদের একটি তথাকথিত ‘গেম ঘরে’ (Game House) দীর্ঘ দুই মাস আটকে রাখা হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি সরবরাহ না করে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনরা।
৭ দিনের দুঃসহ যন্ত্রণা ও সাগরে সলিল সমাধি গত ২৩ মার্চ লিবিয়া উপকূল থেকে একটি রাবারের হাওয়াই ট্রলারে করে তাদের গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেয় পাচারকারীরা। মাঝসমুদ্রে যাওয়ার পর ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। দিক নির্ণয়ের জন্য কোনো 'GPS' বা স্যাটেলাইট ফোন (Satellite Phone) ছাড়াই তাদের মাঝসমুদ্রে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সাত দিন ধরে খাদ্য ও পানীয় জলের তীব্র সংকটে এবং সমুদ্রের লোনা জলের প্রভাবে ট্রলারের ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক মারা যান, যাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সঙ্গে সঙ্গেই মাঝসমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গ্রিসের উপকূল রক্ষীবাহিনী জীবিতদের উদ্ধার করে ক্যাম্পে নিয়ে গেলে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি প্রকাশ্যে আসে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আইনি হুঁশিয়ারি এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যেসব অসাধু দালাল বা পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে এই তরুণেরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা আবারও আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রার ভয়াবহ ঝুঁকি এবং 'Human Trafficking' বা মানবপাচারের এক অন্ধকার দিককে। ১২টি পরিবারের স্বপ্ন এখন ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে বিলীন হয়ে গেল।