"তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে"—বাঙালির যেকোনো মাঙ্গলিক উৎসব এই সুর ছাড়া যেন পূর্ণতা পায় না। প্রেম, ভক্তি আর বিরহের আকুতিকে যিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় সুরের বন্ধনে বেঁধেছিলেন, তিনি লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট রাধারমণ দত্ত। আজ, ১০ নভেম্বর, এই মহান সাধক কবির প্রয়াণ দিবস। যে দিনে ৮২ বছর বয়সে তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছিলেন, সেই দিনটিতে দাঁড়িয়ে তাঁর রেখে যাওয়া সুরের বিশাল সাম্রাজ্য এবং তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটার বর্তমান পরিস্থিতি এক গভীর প্রশ্ন তৈরি করে।
সাধক থেকে স্বভাবকবি: যে যাত্রাপথ অমরত্ব দিয়েছে
১৮৩৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে এক বিদগ্ধ পরিবারে রাধারমণ দত্তের জন্ম। পিতা রাধামাধব দত্ত ছিলেন একাধারে পণ্ডিত ও সংগীতজ্ঞ। সেই পারিবারিক আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু কৈশোরে পিতাকে হারানোর পর জাগতিক বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমে আসে, মন ধাবিত হয় আধ্যাত্মিকতার দিকে। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ সন্ধানে তিনি সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৈষ্ণব, শাক্ত ও সহজিয়া মতে সাধনা শুরু করেন। এই আধ্যাত্মিক যাত্রাই তাঁর ভেতরের স্বভাবকবিকে জাগ্রত করে তোলে। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমে আকুল হয়ে তিনি সৃষ্টি করতে থাকেন একের পর এক কালজয়ী পদ, যা আজ বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ।
ধামাইল থেকে দেহতত্ত্ব: সুরের বহুমাত্রিক জগৎ
রাধারমণ দত্তের গানের জগৎ অবিশ্বাস্য রকমের বৈচিত্র্যময়। তাঁর গানের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়। ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া’, ‘জলে গিয়াছিলাম সই’, কিংবা ‘মুর্শিদ বলি নৌকা ছাড়ো’—এর মতো গানগুলো প্রমাণ করে তাঁর দর্শন কতটা গভীর ও জীবনঘনিষ্ঠ ছিল। দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, ভক্তিমূলক পদের পাশাপাশি তিনি সৃষ্টি করেছেন 'ধামাইল' নামক এক অনবদ্য গীত ও নৃত্যশৈলী, যা সিলেট অঞ্চলের নারীদের উৎসব-পার্বণের প্রধান অনুষঙ্গ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাধারমণের গানে ধর্মীয় গোঁড়ামির কোনো স্থান ছিল না। তিনি অবলীলায় ‘আল্লাহ’ ও ‘ঈশ্বর’, ‘গুরু’ ও ‘মুর্শিদ’ শব্দকে এক সুতোয় গেঁথেছেন, যা তৎকালীন সমাজে অসাম্প্রদায়িকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তাঁর গানে স্বদেশপ্রেমের আকুতিও ধ্বনিত হয়েছে, যেমন—‘দেখলাম দেশের এই দুর্দশা, ঘরে ঘরে চোরের বাসা’।
কিংবদন্তীর স্মৃতিচিহ্নে অবহেলার প্রতিধ্বনি
যে রাধারমণের গান আজ দুই বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, বিস্ময়করভাবে তাঁর নিজের ভিটেমাটিই আজ অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই আইনি জটিলতার কারণে তাঁর জন্মভিটায় কোনো স্থায়ী সংরক্ষণ বা উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, যে মাটিতে বসে তিনি হাজারো অমর সুর সৃষ্টি করেছিলেন, তা আজ অবহেলিত।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও রাধারমণ ভক্তদের দীর্ঘদিনের দাবি, তাঁর জন্মভিটায় একটি ‘রাধারমণ কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করা হোক, যেখানে তাঁর সৃষ্টি ও জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা ও চর্চার সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এ বিষয়ে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তার বাস্তবায়ন এখনো অনেক दूर। এই মহান শিল্পীর অমূল্য legacy যখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, তখন তাঁর নিজের ভূমিতে এই অবহেলা এক গভীর আক্ষেপের জন্ম দেয়।
১৯১৫ সালের আজকের দিনে তিনি দেহত্যাগ করলেও, তাঁর সুর আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। রাধারমণের স্মৃতি রক্ষা করা শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো নয়, বরং বাংলা লোকসংগীতের শিকড়কে রক্ষা করার সামিল। তাঁর গানের মতোই তাঁর স্মৃতিও সযত্নে সংরক্ষিত হোক—এই তাঁর প্রয়াণ দিবসে এটাই একমাত্র চাওয়া।