মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা বা ‘Supreme Leader’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মোজতবা হোসেইনি খামেনি। তিনি প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র। তেহরানে নিজ কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন যৌথ বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এক জরুরি পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘Daily Mail’ এবং ইরানি টিভি নেটওয়ার্কের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আইআরজিসি-র প্রভাব ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের নাটকীয় সিদ্ধান্ত ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করার পেছনে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘Islamic Revolutionary Guard Corps’ (IRGC)-এর সরাসরি চাপ ছিল বলে জানা গেছে। ইরানের ‘Assembly of Experts’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ সাধারণত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে। তবে ‘Mail’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডোরা মোজতবাকেই ক্ষমতার কেন্দ্রে বসাতে বাধ্য করেছেন।
মজার বিষয় হলো, খামেনি নিজে গত বছর যখন সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন, সেখানে মোজতবার নাম ছিল না। শিয়া ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘Dynastic Succession’ বা পিতা-পুত্রের উত্তরাধিকারকে খুব একটা ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। তা সত্ত্বেও, বর্তমান চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মোজতবাকেই বেছে নেওয়া হলো।
ছায়ার আড়ালে থাকা এক ‘পাওয়ারফুল’ ব্যক্তিত্ব মোজতবা খামেনি কোনো প্রথাগত উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা বা ‘Cleric’ নন। এমনকি রাষ্ট্রীয় কোনো দাপ্তরিক পদেও তিনি কখনও আসীন ছিলেন না। কিন্তু গত দুই দশক ধরে তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থায় পর্দার আড়ালে থেকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা মোজতবা সামরিক নেতৃত্বের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি এতদিন খামেনির ‘Gatekeeper’ হিসেবে কাজ করতেন, যা তাকে অলিখিতভাবে রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল।
বিশাল সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোজতবা খামেনির ওপর ‘Sanctions’ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি একটি বিশাল গ্লোবাল প্রপার্টি এম্পায়ার বা বৈশ্বিক সম্পত্তি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘Bloomberg’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমা বাজারগুলোতে তার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে-র তদন্ত অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে ১৩৮ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের একটি বিলাসবহুল সম্পত্তিও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তার এই ‘Billion-Dollar Investment Empire’ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘকাল ধরেই সমালোচনা চলছে।
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও টিকে থাকার লড়াই মোজতবা খামেনি ইরানের প্রভাবশালী রক্ষণশীল রাজনীতিক গোলাম-আলী হাদ্দাদ-আদেলের কন্যা জাহরা হাদ্দাদ-আদেলকে ২০০৪ সালে বিবাহ করেন। গত শনিবারের সেই ভয়াবহ হামলায় খামেনির পরিবারের প্রায় সব সদস্য—স্ত্রী, কন্যা, নাতি-নাতনি এবং পুত্রবধূ জাহরা নিহত হন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র মোজতবাই অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এই ব্যক্তিগত শোক এবং জাতীয় সংকটের মুহূর্তে তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, যখন ইরান এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত।
শিনিয়ত পন্থী আলেমদের মধ্যে মোজতবার এই নির্বাচন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান সমরকালীন পরিস্থিতিতে ‘IRGC’-র সমর্থনপুষ্ট মোজতবা খামেনি কতটা সফলভাবে ইরানকে এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারেন, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান পর্যালোচনার বিষয়।