প্রতিটি বাঙালি পরিবারেই গর্ভধারণের আগে বা পরে একটি প্রশ্ন প্রায়শই ওঠে—স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ (Blood Group) যদি একই হয়, তাহলে কি গর্ভস্থ সন্তানের কোনো শারীরিক ঝুঁকি থাকে? এই প্রশ্নটি বহু দম্পতির মনেই গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এই উদ্বেগ নিরসনে চিকিৎসকদের মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট: রক্তের গ্রুপ এক হওয়া স্বাভাবিক এবং এতে শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তবে, ব্যতিক্রম রয়েছে শুধু একটি ক্ষেত্রে, যা জানতে চিকিৎসা বিজ্ঞান (Medical Science)-এর দুটি মূল ফ্যাক্টর সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক।
রক্তের গ্রুপ নির্ধারণের ভিত্তি: এবিও ও আরএইচ ফ্যাক্টর
চিকিৎসকরা জানান, আমাদের রক্তের গ্রুপ মূলত দুটি মূল ফ্যাক্টরের (Factor) ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়: একটি হলো এবিও ফ্যাক্টর (ABO Factor) এবং অন্যটি হলো আরএইচ ফ্যাক্টর (Rh Factor)।
ABO Factor: এর ওপর ভিত্তি করেই আমাদের রক্তের গ্রুপগুলি এ (A), বি (B), এবি (AB), ও ও (O)—এই চারটি ভাগে বিভক্ত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়ায় প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষের রক্তের গ্রুপ 'B', যা এই অঞ্চলে একই গ্রুপ হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
Rh Factor: এই ফ্যাক্টরটি নির্ধারণ করে রক্ত পজিটিভ (Positive) নাকি নেগেটিভ (Negative)। এশিয়ায় মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ, যেখানে ইউরোপ বা আমেরিকাতে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ।
স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কি সত্যিই ঝুঁকি?
স্বামী এবং স্ত্রী—দুজনেরই রক্তের গ্রুপ একই হওয়া, যেমন দুজনেই A+ বা O-, এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি জৈবিক ঘটনা। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন যে, এক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশুর ওপর এর কোনো কমপ্লিকেশন (Complication) বা ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে না। এই বিষয়ে যে উদ্বেগ প্রচলিত আছে, তা মূলত লোকমুখে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা (Myth)।
আসলে, রক্তের গ্রুপ এক হওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা হয় যখন দুটি Rh ফ্যাক্টর আলাদা হয়, বিশেষত একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে।
আসল বিপদ কোথায়? 'Rh আইসোইমিউনাইজেশন' (Rh Isoimmunization)
দম্পতিদের মধ্যে একমাত্র যে পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের বিশেষ মনোযোগ এবং সতর্কতার প্রয়োজন হয়, তা হলো যখন স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ (Rh- Negative) এবং স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ (Rh- Positive) হয়। এই পরিস্থিতিকে Rh আইসোইমিউনাইজেশন বা Rh ইনকম্প্যাটিবিলিটি (Rh Incompatibility) বলা হয়।
সমস্যা: এমন ক্ষেত্রে, গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময় যদি শিশুর পজিটিভ রক্ত মায়ের নেগেটিভ রক্তের সঙ্গে মিশে যায়, তবে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডি (Antibody) তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডিগুলি পরবর্তী গর্ভাবস্থায় শিশুর রক্তকণিকা (Red Blood Cells) ধ্বংস করতে পারে, যা শিশুর মধ্যে মারাত্মক রক্তাল্পতা (Anaemia), জন্ডিস এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষতি বা জীবনের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
সহজ সমাধান: তবে আধুনিক প্রসূতি চিকিৎসায় (Obstetrics) এর সহজ সমাধান রয়েছে। বর্তমানে এই Rh ইনকম্প্যাটিবিলিটি প্রতিরোধের জন্য একটি টিকা বা ইনজেকশন (Injection) দেওয়া হয়, যা অ্যান্টি-ডি ইনজেকশন (Anti-D Injection) নামে পরিচিত। গর্ভাবস্থার নির্দিষ্ট সময়ে এবং শিশুর জন্মের পর এই টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে এই জটিলতা সম্পূর্ণভাবে এড়ানো যায়।
থ্যালাসেমিয়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাবা-মায়ের রক্তের গ্রুপ এক হলে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) রোগ হয়। চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলেন যে, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ (Genetic Blood Disorder), যা রক্তের গ্রুপ এক হওয়ার সঙ্গে সামান্যতমও সম্পর্কযুক্ত নয়। এই রোগ হয় তখনই, যখন বাবা ও মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়া-বাহক (Thalassemia Carrier) হন।
গর্ভধারণের আগেই হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস (Haemoglobin Electrophoresis) পরীক্ষা করে বাবা-মা উভয়েই বাহক কিনা, তা জেনে নেওয়া উচিত। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা ও সঠিক পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহারে বলা যায়, স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হওয়া নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেবল স্ত্রীর Rh নেগেটিভ এবং স্বামীর Rh পজিটিভ হলে যথাযথ চিকিৎসা বা টিকা (Vaccine) নিলে শিশুর সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।