দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচন (National Election) অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা (Political Stability) ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি হবে না এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। একই সঙ্গে ব্যাংক লুটকারীদের মূলধন সহায়তার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করে এটিকে লুটেরাদের উৎসাহিত করার শামিল বলে অভিহিত করেছেন।
প্রগতিশীল ব্যবসায়ী পরিষদের নেতা শওকত আজিজ রাসেল এবং আসন্ন এফবিসিসিআই (FBCCI) নির্বাচনে সহ-সভাপতি প্রার্থী সাকিফ শামীম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান সংকট এবং সমাধানের পথ নিয়ে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক মুক্তির আহ্বান: নির্বাচনের ইশতেহার চাই
শওকত আজিজ রাসেল বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর এখন নির্বাচনের ইশতেহার (Election Manifesto) দিতে হবে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ওই ইশতেহার নিয়ে আলোচনার দরকার হলে, তা করা প্রয়োজন।”
তিনি মনে করেন, নির্বাচন দিয়ে অর্থনীতি ও উদ্যোক্তাদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, “অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের যে প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসা পরিবেশ উন্নতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি। নির্বাচিত সরকার ছাড়া ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হবে না, অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে না।” তিনি স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণ এবং শ্রম আইন সংশোধনের (Labour Law Reform) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার উপর জোর দেন।
বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment - FDI) প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সরকার বেপরোয়া। কিন্তু যে দেশের বিমানবন্দর আগুনে পোড়ে, সেখানে কে বিনিয়োগ করবে? দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ (Investment Climate) নেই।”
ব্যাংকিং খাতে লুটেরা তোষণ ও নীতিগত ব্যর্থতা
দেশের ব্যাংকিং খাতের (Banking Sector) তীব্র সমালোচনা করে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “যারা ব্যাংক লুট করেছে সেই গ্রাহক, ব্যাংকার কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ তাদের মূলধন সহায়তার (Capital Assistance) মাধ্যমে এখন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। যা লুটেরাদের উৎসাহিত করার শামিল।”
তিনি কঠোর নীতি সংস্কারের (Policy Reform) দাবি জানিয়ে বলেন, “যেসব ব্যাংকের ৯০ শতাংশের বেশি ঋণখেলাপি (Default Loan), তা আবার একীভূত করার (Merge) কী আছে? দেশকে ঠিক করতে চাইলে নীতি সংস্কার করতে হবে। যে ব্যাংকগুলো টাকা পাচার (Money Laundering) ও লুটের সঙ্গে জড়িত, সেক্ষেত্রে গ্রাহকের টাকা ফেরত দিয়ে ব্যাংকগুলো বন্ধ করা হোক। এসব ব্যাংকের মালিকানা কখনো নষ্ট হবে না। কোনো না কোনো সময় আবার ফিরে এসে ছোবল মারবে তারা।”
এছাড়াও, অগ্রাধিকারভিত্তিতে শিল্পে গ্যাস সংযোগ এবং রপ্তানিতে (Export) ৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ প্রণোদনা (Incentive) দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরকার সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীরা আলোচনা করতে চাইলেও তাঁরা সময় দেননি। তিনি জানান, এমনকি বিজিএমইএ (BGMEA) প্রেসিডেন্টও এখন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একটি মিটিং পাননি।
বিনিয়োগে বাধা: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
প্রগতিশীল ব্যবসায়ী পরিষদের নেতা ও আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচনে সহ-সভাপতি প্রার্থী সাকিফ শামীম দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন বিরাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও দ্বিধা তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা চান।”
তিনি স্বীকার করেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় বাজার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বড় আকারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট না হওয়ার কারণ প্রধানত অভ্যন্তরীণ। তিনি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে (Bureaucratic Complexity) দায়ী করেন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি হাসপাতাল করতে ২৭/২৮টি লাইসেন্স লাগে, যা সংগ্রহ করতে ২-৩ বছর সময় লেগে যায় এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে। ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ (One-Stop Service) চালু করা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সমাধান: সুশাসন, স্বচ্ছতা ও এফডিআই আকর্ষণ
সাকিফ শামীম এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়ার উপর গুরুত্ব দেন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি (Accountability) নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “বিনিয়োগবান্ধব সংস্কৃতির পাশাপাশি ব্যবসার জন্য আগে থেকে অনুধাবনযোগ্য একটি স্থিতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন।” তিনি মনে করেন, একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। তাই নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়।
তিনি জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় কারখানা খোলা রাখা যায় না, স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়। “ফলে বিনিয়োগকারী বিপাকে পড়েন। কে এই লোকসান নিতে চায়? ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কেউ বিনিয়োগে সাড়া দিচ্ছে না।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনা করে বিনিয়োগ আহ্বান জানালে দেশে শিল্প-বিনিয়োগ বাড়বে। আর বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতিতে গতি আসবে, রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি (Inflation) কমবে।