প্রথম জীবন ও কেরিয়ার গ্রাফ
একসময় তিনি ছিলেন দক্ষিণ ভারতের অন্যতম আলোচিত তারকা, যাঁর স্ক্রিন প্রেজেন্স (Screen Presence) ছিল কিংবদন্তি মোহনলাল, মাম্মুট্টি এবং রজনীকান্তের মতো সুপারস্টারদের (Superstars) পাশেও অবিস্মরণীয়। মালয়ালম, তামিল ও তেলেগু—এই তিন ভাষার ৪০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ১৮ বছরের সফল কেরিয়ার গ্রাফ তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর নাম ভিজি আশ্বত; কিন্তু মাত্র ৩৪ বছর বয়সে এক ব্যর্থ প্রেম এবং ভুল চিকিৎসা তাঁর জীবনকে এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।
১৯৬৬ সালে জন্ম নেওয়া ভিজি আশ্বত মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ১৯৮২ সালে লেখক-পরিচালক গঙ্গাই আমারনের ‘কোজি কুভুথু’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে ডেবিউ (Debut) করেন। প্রভু ও সুরেশের মতো তারকাদের সঙ্গে অভিনীত সেই চলচ্চিত্রটি ছিল বক্স অফিসে হিট। সেখান থেকেই শুরু হয় ভিজি আশ্বতের তারকাযাত্রা।
পরের বছরই তিনি বিজয়কান্ত, কার্তিক-এর মতো জনপ্রিয় অভিনেতাদের বিপরীতে কাজ করেন এবং সাফল্য পান। এরপর তিনি মোহনলালের সঙ্গে ‘উয়ারাঙ্গালিল’ ও ‘নায়কান’, মাম্মুট্টির সঙ্গে ‘অননুম মিনদাথা ভার্যা’ এবং রজনীকান্তের সঙ্গে ‘মিস্টার ভারত’-এর মতো মাল্টি-স্টারার (Multi-Starrer) চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের প্লাটফর্ম (Platform) মজবুত করেন। তিনি মালয়ালমের প্রথম থ্রিডি চলচ্চিত্র ‘পৌর্ণমি রাভিল’-এও কাজ করেন। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে এসে ধীরে ধীরে তাঁর হাতে ছবির সংখ্যা কমতে থাকে।
মেডিক্যাল ম্যালপ্র্যাকটিস ও জীবন বিপর্যস্ত
ভিজি আশ্বতের জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি। পিঠের ব্যথার জন্য চেন্নাইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালে তিনি মেরুদণ্ডে একটি অস্ত্রোপচার করান। কিন্তু সেই অস্ত্রোপচার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ভুল চিকিৎসার কারণে তিনি ১৩ দিন ধরে জ্বর ও সংক্রমণে (Infection) ভোগেন।
ভুল চিকিৎসার (যা Medical Malpractice নামে পরিচিত) কারণে তাঁকে পরপর আরও দুটি সার্জারি করাতে হয়। এই কঠিন সময়ে তিনি প্রায় তিন বছর ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন। চলচ্চিত্র জগৎ এই দীর্ঘ বিরতির পর তাঁকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এই অন্ধকারে একমাত্র বিজয়কান্তই তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং নিজের ছবি ‘সিম্মাসনম’-এ অভিনয়ের সুযোগ দেন। তিনি তাঁকে পরের ছবিতেও নেওয়ার প্রতিশ্রুতি (Commitment) দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর আগেই সব শেষ হয়ে যায়।
প্রেমভঙ্গ: ডিরেক্টরের প্রত্যাখ্যান ও মর্মান্তিক পরিণতি
২০০০ সালের ২৭ নভেম্বর, মাত্র ৩৪ বছর বয়সে চেন্নত্নাইয়ের ফ্ল্যাটে ভিজি আশ্বত আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর পেছনের মূল কারণ ছিল প্রেমঘটিত হতাশা। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর এক বন্ধুর কাছে একটি ভয়েস মেসেজ (Voice Message) রেখে যান, যা তাঁর মৃত্যুরহস্য উন্মোচন করে।
ভিজির অভিযোগ ছিল—তাঁর প্রেমিক, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের ডিরেক্টর (Director) এ আর রমেশ তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছেন। রমেশ তখন বিবাহিত ছিলেন এবং ভিজিকে কেবল মিথ্যা আশ্বাসই দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনার পর রমেশ কোয়েম্বাটুরে পালিয়ে যান, পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তাঁর স্ত্রী এ আর সুমতী ও বন্ধু চিন্নাসামিকেও অভিযুক্ত করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: এক অতি সংবেদনশীল নারী
আদালতে প্রসিকিউশনের দাবি ছিল—মৃত্যুর তিন দিন আগে এক অনুষ্ঠানে রমেশের সঙ্গে ভিজির তুমুল তর্ক-বিতর্ক হয় এবং রমেশ তাঁকে অপমানসূচক কথা বলেন, যা সহ্য করতে না পেরেই ভিজি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
তবে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে চেন্নাই আদালত এই তিন অভিযুক্তকেই খালাস দেয়। আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ছিল—ভিজি আশ্বত ছিলেন ‘অতি সংবেদনশীল নারী, জীবনের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না।’ আদালতের এই ফাইনাল জাজমেন্টের (Final Judgment) মধ্য দিয়ে শেষ হয় ১৮ বছরের এক প্রতিভাবান অভিনেত্রীর করুণ, অসমাপ্ত জীবনকাহিনি।