• আন্তর্জাতিক
  • অঙ্গীকারের ব্যর্থতা ও বঞ্চনার দাগ নিয়ে COP 30: 'বৈশ্বিক মুটিরাও'-এর ডাক কতটা ফলপ্রসূ?

অঙ্গীকারের ব্যর্থতা ও বঞ্চনার দাগ নিয়ে COP 30: 'বৈশ্বিক মুটিরাও'-এর ডাক কতটা ফলপ্রসূ?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
অঙ্গীকারের ব্যর্থতা ও বঞ্চনার দাগ নিয়ে COP 30: 'বৈশ্বিক মুটিরাও'-এর ডাক কতটা ফলপ্রসূ?

আমাজনে শুরু হওয়া জলবায়ু ন্যায়বিচারের মঞ্চে Global South-এর সংগ্রামমুখর মানুষের কথা কি শুনবে Multinational Company ও বিশ্বনেতারা?

আমাজনে COP 30: ‘বৈশ্বিক মুটিরাও’-এর আহ্বান

পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চল আমাজনের ব্রাজিল অংশে, দেশটির প্যারা রাজ্যের বেলেম শহরে গত সোমবার শুরু হয়েছে জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-৩০ (COP 30)। ‘বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের’ সবচেয়ে বড় এই জলবায়ু নাটকের ৩০তম আসর চলবে টানা বারো দিন ধরে। তবে এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে (Global Platform) আলোচনার মূল সুর হলো—বিগত সম্মেলনগুলোর অঙ্গীকারভঙ্গ, সময়ক্ষেপণ এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কারণে সৃষ্ট গভীর হতাশা।

সম্মেলনের মূল স্লোগান করা হয়েছে ‘বৈশ্বিক মুটিরাও’। আমাজন বনের টুপি-গুয়ারানি আদিবাসীদের ভাষার শব্দ ‘মুটিরাও’-এর অর্থ হলো সম্মিলিত প্রচেষ্টা (Collective Effort)। এই আহ্বানের মাধ্যমে জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীর প্রতিটি নাগরিকের নিজস্বতাসহ এক কাতারে আসার প্রয়োজনীয়তাকে জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel) ও অন্যায় ভোগবিলাসের কারণে পৃথিবীর যে মুমূর্ষু দশা, তার সমাধান কি শুধু সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্লোগানেই আসবে?

অঙ্গীকারভঙ্গ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের মঞ্চ

আকাশপথে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে লেখক দেখেছেন—‘লুকিয়ে পড়া’ এই গ্রহটি আজ যুদ্ধ, সহিংসতা, দখল, অন্যায় ভোগবিলাস এবং সীমাহীন কার্বন নিঃসরণের (Carbon Emission) মতো নির্দয় বাহাদুরির কারণে মুমূর্ষু। জলবায়ু ন্যায়বিচারের মঞ্চ হিসেবে ঘোষিত হলেও, পৃথিবীর এই প্রকাশ্য সব নির্দয় বাহাদুরির মূল হোতারা এখনও এই জলবায়ুমঞ্চে জবাবদিহির আওতায় আসেনি।

বিগত বছরগুলোতে জলবায়ু সম্মেলনে বারবার উঠে এসেছে বৈশ্বিক ১.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance), অভিযোজন (Adaptation), প্রশমন (Mitigation), এবং এনডিসি (NDC) বাস্তবায়নের মতো গুরুগম্ভীর বিষয়। কিন্তু এসব দেনদরবার মূলত কার্বন দূষণের জন্য দায়ী বহুজাতিক কোম্পানি (Multinational Companies) এবং উন্নত বিশ্বের বিশ্বনেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে জলবায়ু-আঘাতের শিকার গ্লোবাল সাউথের (Global South) কোটি কোটি মানুষের জীবনভাষ্য উপেক্ষিতই থেকে যায়।

প্রাণসংহারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আজ জলবায়ুপঞ্জিকাকে উল্টাপাল্টা করে ফেলছে। অ্যানিমেশন ছবি ‘দ্য লোরাক্স’-এর থিনিডভিল শহরের আখ্যানটি যেন আজকের পৃথিবীর নির্মম বাস্তবতা। যেখানে সব জীবিত গাছ খুন করে, সব কিছু প্লাস্টিক ও মেশিনে চলে এবং একটি করপোরেট কোম্পানি (Corporate Company) বোতলে ভরে অক্সিজেন বিক্রি করে।

আমাদের পৃথিবী যেন সেই থিনিডভিলের দিকেই এগিয়ে চলেছে—যেখানে গাছপালা, প্রাণ ও প্রকৃতি নির্দয়ভাবে খুন হচ্ছে। এমনকি বেলেম জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের জন্য আমাজন বনেরই একটি বিশাল অংশকে হত্যা করা হয়েছে বলে গুরুতর বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত আমাজনকে ছিদ্র করে সম্মেলন আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিকারকর্মীরা।

বনবিবি থেকে কুরোপিরা: আদিবাসী জ্ঞানের ইনটিগ্রেশন

বেলেম সম্মেলন কর্তৃপক্ষ আমাজন বনের টুপি-গুয়ারানি আদিবাসীদের অরণ্যরক্ষক শক্তি ‘কুরোপিরা’-কে সম্মান জানিয়েছে। এই অরণ্যরক্ষক শক্তি কেবল পৌরাণিক নয়, আমাজন বনে সাংস্কৃতিকভাবে প্রবহমান।

এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের (Traditional Ecological Knowledge - TEK) ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের সুন্দরবনের বনবিবি, শালবনের বেলছিরি বা সাঁওতালদের জাহেরথানের মতো লোকায়ত জ্ঞানকাণ্ডের মিল রয়েছে। সুন্দরবন অববাহিকার মৌয়ালী, বাওয়ালী ও মুন্ডা বনজীবীরা বিশ্বাস করেন, বনবিবিই বাদাবন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের লোকায়ত জলবায়ুজ্ঞান, যেমন—বাবুই পাখির বাসা দেখে বৃষ্টির পূর্বাভাস বা ধানের বৈচিত্র্যময় জাত (কালমুনি, ধইরা, সোনাশাইল) টেকসই ব্যবস্থাপনা (Sustainable Management) তৈরি করেছে। জলবায়ুবিষয়ক রাষ্ট্রীয় নীতি ও পলিসিতে (Policy) এই নিম্নবর্গের জীবনভাষ্য ও TEK প্রতিষ্ঠা করাটাই বেলেম সম্মেলনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

আশালতা-রুমালীদের জীবনসংগ্রাম ও ফাইনান্সিং চ্যালেঞ্জ

জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি সামাল দিচ্ছে বিশ্বের গ্রামীণ নিম্নবর্গ এবং অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতের (Informal Sector) কর্মীরা। বাংলাদেশের সাতক্ষীরার আশালতা মুন্ডা লবণপানি ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে দিনমজুরি করেন। রাজশাহীর রুমালী হাঁসদা (কৃষিশ্রমিক) ভূমিহীনতা ও জাতিগত প্রান্তিকতা সামাল দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২৪) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী, যার মধ্যে ৯৬.৬ শতাংশ নারীই আশালতা বা রুমালীর মতো অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতে জড়িত। এই নিম্নবর্গ নারীদের জীবন আজ জলবায়ু-সংকটের নির্মম বৈষম্যের মুখোমুখি। বতসোয়ানার কৃষক ডিয়ান সিবান্দের মতো গ্রামীণ নারীও খরা আর বৃষ্টিহীনতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার শিকার।

বেলেম সম্মেলনে যে ‘বেলেম ঘোষণা’ তৈরি হয়েছে, তাতে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খাদ্য উৎপাদকের সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি উঠেছে। কিন্তু কার্বন দূষণ ও অর্থায়নের জন্য দায়ী বিশ্বনেতারা কি আদৌ এই সংগ্রামমুখর মানুষের বাস্তবতা (Reality) শুনতে প্রস্তুত? নাকি ‘বৈশ্বিক মুটিরাও’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে—সেই প্রশ্ন নিয়েই শেষ হচ্ছে COP 30-এর এই গুরুত্বপূর্ণ আসর।