জুলাই সনদের বাস্তবায়ন: ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য ধরে সরকারের পদক্ষেপ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কারের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকা মতপার্থক্য সত্ত্বেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। সরকার মনে করে, সংস্কারের লক্ষ্য, নীতি ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও মধ্যে মতভেদ না থাকায় এবং দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে (July Charter) মূল দলিল হিসেবে ধরে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে গেজেট জারি করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেন, “আমরা সব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত সংস্কারের লক্ষ্যকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
গণভোটের ব্যালট: জনগণের সামনে চারটি প্রশ্ন
জুলাই সনদের আলোকে সরকার গণভোটের ব্যালটে (Ballot) নাগরিকদের মতামতের জন্য চারটি প্রশ্ন নির্ধারণ করেছে। এই চারটি বিষয়ের ওপর একটি মাত্র প্রশ্নে নাগরিকদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে তাঁদের মতামত জানাতে হবে:
‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
১. নির্বাচনকালীন সরকার ও প্রতিষ্ঠান: তত্ত্বাবধায়ক সরকার (Caretaker Government), নির্বাচন কমিশন (EC) এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বাছাইয়ে বিএনপির আপত্তি সত্ত্বেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গণভোটে)।
২. সংসদের উচ্চকক্ষ: আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট (Bicameral)। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। (উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতিতে বিএনপির ভিন্নমত সত্ত্বেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গণভোটে)।
৩. ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের বাধ্যবাধকতা: প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিতকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. অন্যান্য সংস্কার: জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোটের ফলাফল ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ
গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে:
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন: আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
সংস্কারের সময়সীমা: পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। (ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে ২৭০ কার্যদিবস থাকলেও চূড়ান্ত আদেশে তা ১৮০ দিন করা হয়েছে এবং স্বয়ংক্রিয় সংযোজনের বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া হয়েছে)।
উচ্চকক্ষ গঠন: সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (Proportional Representation - PR) উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।