• Articles
  • ‘জংলাবিড়া’ প্রজাপতি: ডানায় আলপনার রহস্য ও দুর্লভ দর্শন; প্রকৃতিতে তার ‘বাটারফ্লাই এফেক্ট’

‘জংলাবিড়া’ প্রজাপতি: ডানায় আলপনার রহস্য ও দুর্লভ দর্শন; প্রকৃতিতে তার ‘বাটারফ্লাই এফেক্ট’

১ মিনিট পড়া
‘জংলাবিড়া’ প্রজাপতি: ডানায় আলপনার রহস্য ও দুর্লভ দর্শন; প্রকৃতিতে তার ‘বাটারফ্লাই এফেক্ট’

কুমিল্লার ঝোপে গাঢ় বাদামি বর্ণের এই সুন্দর পতঙ্গটির বৈজ্ঞানিক নাম Mycalesis perseus। এর ডানার চক্ষুবিন্দুর বিন্যাসই এটিকে সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রজাতি থেকে আলাদা করে তোলে।

কুমিল্লা: স্রষ্টার বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির সমাহার এই পৃথিবীর সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। এসব মনোমুগ্ধকর সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম হলো রংবাহারি প্রজাপতি। প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাস ঘিরে প্রজাপতির ওড়াউড়ির দৃশ্য সত্যিই একটি চোখজুড়ানো Visual Treat। প্রকৃতির এই নিবিড় সম্পর্কে যেন এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি হয়।

সম্প্রতি এমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা গেছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার কুমিল্লা-মিরপুর সড়কের পাশে। সড়কের পাশের ঘন ঝোপ ও সীমানাপ্রচীর ঘিরে বাদামি রঙের 'জংলাবিড়া' (Janglabira) প্রজাপতির নকশাখচিত ডানার ওড়াউড়ি প্রকৃতিতে যেন ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। এদের ডানায় আঁকা রঙিন আলপনা অবাক করার মতো সুন্দর এবং মন কেড়ে নেওয়ার মতো।

বৈজ্ঞানিক পরিচয় ও দুর্লভ বৈশিষ্ট্য

এই অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতিটির Scientific Name হলো Mycalesis perseus। এটি Nymphalidae গোত্রের এবং Satyrinae Subfamily-এর অন্তর্ভুক্ত, যার আরেক পরিচিত নাম Bushbrown। এর গাঢ় বাদামি বর্ণের শরীরের কারণে এটিকে এই নামে অভিহিত করা হয়। ডেনমার্কের পোকাবিশারদ জন ক্রিস্টিয়ান ফ্যাবরিসিয়াস ১৯৭৫ সালে প্রথম এই প্রজাতিটির বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন।

জংলাবিড়া প্রজাতিকে সাধারণভাবে দেখতে একইরকম লাগা আরও তিনটি বুশব্রাউন প্রজাতি (খয়রাবিড়া, তাঁতরাবিরা ও হোয়াইট-লাইন বুশব্রাউন)-এর সঙ্গে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। তবে জংলাবিড়া প্রজাপতির একটি গুরুত্বপূর্ণ Distinguishing Feature রয়েছে। সাধারণত সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে পেছনের ডানার Eyespot (চক্ষুবিন্দু)-এর সারিতে শেষ চারটি বিন্দু একই সরলরেখায় অবস্থান করে, কিন্তু জংলাবিড়ার ক্ষেত্রে চারটি বিন্দু একই সরলরেখায় অবস্থান করে না। চতুর্থ Eyespot টি সামান্য বাইরের দিকে ঘেঁষে অবস্থিত, যা এটিকে একটি অনন্য Biological Identity প্রদান করে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এদের ডানা প্রসারিত করলে ৩৮ থেকে ৫৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত হতে পারে।

জীবনধারা ও উড্ডয়ন কৌশল

জংলাবিড়া প্রজাপতি উড়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এদের Flight Pattern ধীরস্থির এবং এরা খুব বেশি উপরে ওঠে না। এরা মাটির কাছাকাছি থেকেই ওড়াউড়ি করে, উড়ার সময় ডানায় এক ধরনের ঝাঁকি দিতে থাকে। এরা সাধারণত উজ্জ্বল ও তীব্র আলোময় পরিবেশ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে।

এই প্রজাতি বেশিরভাগ সময় গাছপালা ছাওয়া ঝোপঝাড়ের আশপাশে অবস্থান করে। বিশেষ করে আমবাগান ও বাঁশবাগানের কাছাকাছি জংলা পরিবেশ এদের Habitat হিসেবে বেশ পছন্দের। এদের এক বিশেষ Behavior হলো, এরা প্রায়শই সকালের দিকে গাছের পাতা, ডাল বা কাণ্ডে বসে Sun Bath করে, তবে ডানা বন্ধ অবস্থায়। ডানা মেলে এদের বসতে খুবই কম দেখা যায়। রোদ পোহানো শেষে আবছা আলোয় শুকনো পাতার ওপর অবস্থান করতে বেশি পছন্দ করে। এরা সাধারণত সকালে, পড়ন্ত বিকেল ও সন্ধ্যায় পুরোপুরি Active হয়।

খাদ্য সংস্থান ও প্রজনন চক্র

জংলাবিড়া প্রজাপতিরা পরিবেশ থেকে নানা ধরনের খাদ্যরস আহরণ করে। এরা পশু-পাখির বিষ্ঠা, পচা ফল এবং ভিজেমাটি বা পাথরের ভিজে ছোপে বসে Nutrient সংগ্রহ করে। সাধারণত পুরুষরাই ভিজেমাটি ও স্যাঁতসেঁতে স্থানে বসে খাদ্যরস আহরণ করে।

এদের ডিম গোলাকার ও ময়লাটে সাদা বর্ণের হয়। ডিম ফুটে যে শূককীট (Larva) বের হয়, সেগুলোর রং খয়েরি। এই শূককীট বিভিন্ন প্রকার ঘাস আহার করে জীবনধারণ করে। পূর্ণাঙ্গ Metamorphosis (রূপান্তর) ঘটার জন্য এরা ঘাসের নিম্নপৃষ্ঠে Pupa (মুককীট) সৃষ্টি করে। মুককীটের রং হয় সবুজ, দেহের নানা স্থানে হলুদ বিন্দু থাকে। সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেই এই Life Cycle সম্পন্ন হয় এবং পূর্ণ প্রজাপতি হয়ে ওঠে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, জংলাবিড়া প্রজাপতি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। ডানা বন্ধ অবস্থায় এদের দেখলে মনে হয় যেন কোনো শিল্পী তুলির আঁচড়ে অপূর্ব আলপনা এঁকেছেন। এই পতঙ্গগুলি পরিবেশ ও Ecological Balance রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে এদের Larva বিভিন্ন ঘাস খেয়ে জীবনধারণ করে এবং এরা নিজেও Food Chain-এর একটি অংশ। যদিও এদের লার্ভা কখনও কখনও ফসলের কচি পাতা খেয়ে থাকে, তবে সামগ্রিকভাবে এদের গুরুত্ব Biodiversity রক্ষায় অনস্বীকার্য।