পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর ইফতারের সময়টি শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে যারা হার্টের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য ইফতার হওয়া উচিত অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং সুষম। সারাদিন অনাহারে থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত তেল, লবণ বা চিনিযুক্ত খাবার রক্ত সঞ্চালন ও হৃদস্পন্দনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, ভুল খাবার নির্বাচনের ফলে ইফতারের পরপরই হৃদরোগীদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
সুস্থ হার্ট বজায় রাখতে ইফতারে যে ৪ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলা অপরিহার্য:
১. ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বাঙালি ইফতার মানেই পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ বা সমুচা। কিন্তু ডুবো তেলে ভাজা এসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ‘ট্রান্স ফ্যাট’ (Trans Fat) এবং ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ (Saturated Fat) থাকে। এই উপাদানগুলো রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং সরাসরি ধমনীতে ‘ব্লক’ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। হৃদ্রোগীদের জন্য এ ধরনের খাবার রক্তচাপকে হুট করে বাড়িয়ে দিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২. সোডিয়াম সমৃদ্ধ বা অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার লবণ বা সোডিয়াম সরাসরি রক্তচাপ (Blood Pressure) নিয়ন্ত্রণ করে। ইফতারে চানাচুর, লবণাক্ত আচার বা প্রসেসড ফুড (Processed Food) খাওয়ার প্রবণতা হার্টের রোগীদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানি ধরে রাখে, যা হৃদ্যন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি করে।
৩. সুগার স্পাইক তৈরিকারী মিষ্টি ও পানীয় রোজার ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই অতিরিক্ত চিনিযুক্ত শরবত, জিলাপি বা অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ করেন। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় (Sugar Spike), যা হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে। বিশেষ করে যাদের হৃদরোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য এই অভ্যাসটি প্রাণঘাতী হতে পারে। চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ বা ফলের রস বেছে নেওয়া উত্তম।
৪. রেড মিট ও ভারী চর্বিযুক্ত খাবার ইফতারে বিরিয়ানি, চর্বিযুক্ত গরুর মাংস বা খাসির কোরমা খাওয়া মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। রেড মিটে (Red Meat) থাকা উচ্চমাত্রার চর্বি হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয় এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এটি হার্টের কার্যক্ষমতাকে ধীর করে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্তনালীর ক্ষতি করে।
সুস্থ হার্টের জন্য আদর্শ ইফতার কেমন হওয়া উচিত?
হৃদ্রোগীদের জন্য ইফতার হতে হবে পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সুস্থ ডায়েট চার্ট নিচে দেওয়া হলো:
শুরুটা হোক প্রাকৃতিক: ১-২টি খেজুর ও সাধারণ তাপমাত্রার পানি দিয়ে ইফতার শুরু করুন। এটি তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাবে।
আঁশযুক্ত খাবার: ইফতারে মৌসুমি ফল এবং প্রচুর সালাদ রাখুন। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার হজমে সহায়তা করে এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
প্রোটিনের উৎস: ভাজাপোড়ার বদলে গ্রিল করা মাছ বা সেদ্ধ মুরগির মাংস (Skinless Chicken) প্রোটিনের চমৎকার উৎস হতে পারে।
কার্বোহাইড্রেট: সাদা চাল বা ময়দার পরিবর্তে লাল চালের জাউ বা ওটস (Oats) হৃদরোগীদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ।
পানীয়: কৃত্রিম রং ও চিনিযুক্ত পানীয়র বদলে লেবুর শরবত (অল্প চিনি বা চিনি ছাড়া) অথবা ডাবের পানি পান করুন।
সুস্থভাবে রোজা পালন করতে হার্টের রোগীদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের সময়সূচী সমন্বয় করা এবং ইফতারে ‘ওভারইটিং’ বা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। মনে রাখবেন, সচেতন খাদ্যাভ্যাসই পারে উৎসবের আমেজকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে।