• বিনোদন
  • ইরফান খানের একমাত্র জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী সিনেমা: জাতীয় চ্যাম্পিয়ন পান সিং তোমার যেভাবে হলেন দুর্ধর্ষ দস্যু!

ইরফান খানের একমাত্র জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী সিনেমা: জাতীয় চ্যাম্পিয়ন পান সিং তোমার যেভাবে হলেন দুর্ধর্ষ দস্যু!

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
ইরফান খানের একমাত্র জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী সিনেমা: জাতীয় চ্যাম্পিয়ন পান সিং তোমার যেভাবে হলেন দুর্ধর্ষ দস্যু!

জীবন থেকে অনুপ্রাণিত ‘পান সিং তোমার’ সিনেমার নেপথ্যের গল্প: চম্বল অঞ্চলের ক্রীড়াবিদ-সুবেদার থেকে ‘এনকাউন্টার’ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য যাত্রায় ইরফান খানের শারীরিক ও মানসিক সংগ্রাম।

চলচ্চিত্র এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম যা বাস্তব জীবনের মহৎ গল্পগুলোকে বড় পর্দায় অমর করে তোলে। প্রয়াত বলিউড অভিনেতা ইরফান খানের জীবনের একমাত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী সিনেমা ‘পান সিং তোমার’-এর গল্পটিও তেমনই এক অবিশ্বাস্য Real Life Story (বাস্তব জীবনের কাহিনী)। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র ছিল না, এটি ছিল এমন এক ক্রীড়াবিদের জীবনগাথা, যিনি ভাগ্যের ফেরে National Champion (জাতীয় চ্যাম্পিয়ন) থেকে হয়ে উঠেছিলেন চম্বল অঞ্চলের দুর্ধর্ষ দস্যু।

কে ছিলেন পান সিং তোমার?

পান সিং তোমারের জন্ম ভারতের মধ্যপ্রদেশের চম্বল নদীর তীরে ভিদোসা গ্রামে। তিনি ছিলেন সেই ভয়ংকর চম্বল অঞ্চলের সন্তান, যা একসময় দস্যুরানি ফুলন দেবীর অভয়ারণ্য ছিল। অন্যান্য যুবকের মতো পান সিংও সেনাবাহিনীতে Subedar (সুবেদার) হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু তাঁর অসাধারণ দৌড়ানোর ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত সামরিক বাহিনীতে এক অনন্য Athlete (ক্রীড়াবিদ) হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

তিনি ছিলেন কিংবদন্তি মিলখা সিংয়ের সমসাময়িক। ১৯৫৮ সালে টোকিও এশিয়ান গেমসে ভারতকে Represent (প্রতিনিধিত্ব) করার সুযোগ পেলেও, প্রতিযোগিতার মাত্র দুই দিন আগে নতুন জুতা পাওয়ায় তিনি ভালো করতে পারেননি। তবে পরবর্তীতে তিনি সাতবার জাতীয় Steeplechase Champion (স্টিপলচেজ চ্যাম্পিয়ন) হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

ট্র্যাজেডি: অন্ধকার পথে যাত্রা

সেনা ও ক্রীড়াজীবনে সাফল্যের পরও পান সিং তোমারের জীবনে নেমে আসে চরম অন্ধকার। পারিবারিক জমিজমা নিয়ে চাচা বাবু সিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে তাঁকে নির্ধারিত সময়ের আগেই সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়।

সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি পঞ্চায়েত, কালেক্টর এবং আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সর্বত্র দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তিনি হতাশ হন। তাঁর পদক ও সার্টিফিকেট নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। শেষ পর্যন্ত যখন তাঁর চাচা ও তাঁর লোকেরা পান সিংয়ের মা ও ছেলেকে প্রহার করে, তখন ন্যায়বিচার না পেয়ে পান সিং নিজেই হাতে অস্ত্র তুলে নেন। প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে তিনি ২৮ জনের একটি দস্যু দল গঠন করেন এবং শুরু হয় তাঁর Outlaw Life (দস্যু জীবন)।

১৯৭৭ সালে ভাই খুন হওয়ার পর পান সিং ও তাঁর দল প্রতিশোধ নিতে গোয়ালিয়রের কাছে নয়জনকে হত্যা করে। এরপর প্রশাসন তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করে ১০ হাজার টাকা। অবশেষে ১৯৮১ সালে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে চলা এক ভয়াবহ Encounter (এনকাউন্টার)-এ তিনি নিহত হন। মৃত্যুর আগে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি পুলিশের কাছে পানি চেয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলে জানা যায়।

গবেষণায় দুই দশক, অর্থায়নে অনীহা

পরিচালক তিগমাংশু ধুলিয়া এই গল্পের স্রষ্টা। শেখর কাপুরের বিখ্যাত সিনেমা ‘ব্যান্ডিট কুইন’ নিয়ে গবেষণা করার সময়ই তিনি পান সিং তোমারের গল্প আবিষ্কার করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই জীবনকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরবেন।

কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। পরিচালক জানান, একজন সুবেদার হলেও দস্যু হয়ে যাওয়ায় সরকারি দপ্তরে পান সিংয়ের কোনো Official Record (নথি) ছিল না। চিত্রনাট্য লেখার জন্য গবেষণা প্রয়োজন হলেও বলিউডের প্রযোজকরা এমন গল্পের জন্য Funding (অর্থায়ন) করতে রাজি ছিলেন না। পরে ইউটিভি স্পটবয় এই Project-এ অর্থায়ন করে পাশে দাঁড়ায়।

তথ্য সংগ্রহের জন্য ধুলিয়ার দল পান সিংয়ের স্ত্রী ইন্দ্রা ও ছেলের সঙ্গে দেখা করে এবং এমনকি দস্যু জীবনের তথ্য জানতে সাবেক দস্যু মোহর সিংয়ের সঙ্গেও আলোচনা করেন। পান সিং তোমারকে নিয়ে গবেষণা করতে তিগমাংশুর প্রায় দুই দশক সময় লেগে যায়।

ইরফান খানের শারীরিক ও মানসিক সংগ্রাম

শারীরিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ছিল ‘পান সিং তোমার’-এর Shooting। সিনেমার প্রয়োজনে ইরফান খান জাতীয় কোচ সৎপল সিংয়ের কাছে স্টিপলচেজের বিশেষ প্রশিক্ষণও নেন। অভিনেতা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শুটিং চলাকালে তিনি বারবার আঘাত পেয়েছেন—পিঠে টান, চোখে আঘাত, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া—মনে হচ্ছিল সিনেমাটি ভিন্নভাবে তাঁর পরীক্ষা নিচ্ছে।

ইরফানের মতে, এই কষ্ট আসলে পান সিংয়ের জীবনেরই প্রতিফলন। একজন মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে খ্যাতি পেলেও স্বীকৃতি পান না, যতক্ষণ না তিনি বিদ্রোহের পথ বেছে নেন। সিনেমাটির Post-Production (মুক্তির প্রক্রিয়া) নিয়েও ইরফান হতাশ ছিলেন। সিনেমাটি বানানো শেষ হলেও এটি মুক্তি পাচ্ছিল না। এই হতাশায় তিনি প্রায় আট-নয় মাস সিনেমাটির কথা ভুলতে চেয়েছিলেন।

স্লিপার হিট এবং জাতীয় পুরস্কার

‘পান সিং তোমার’ মাত্র ৭ কোটি টাকার সীমিত Budget (বাজেট)-এ নির্মিত হয় এবং মাত্র ৬৫ দিনেই এর শুটিং শেষ হয়। মুক্তির সময় এর Promotion (প্রচার) ছিল সীমিত। কিন্তু সিনেমাটির গল্প দর্শকদের মুখে মুখে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি হয়ে ওঠে একটি 'স্লিপার হিট' (যে সিনেমা নীরবে মুক্তি পেয়ে আশ্চর্যজনক সাফল্য অর্জন করে)।

৭ কোটি টাকায় তৈরি এই Biopic (বায়োপিক) প্রায় ১৭ কোটি টাকা Revenue (আয়) করে এবং সমালোচকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি ৬০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে এবং ইরফান খান শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তাঁর জীবনের Sole National Film Award (একমাত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার) অর্জন করেন।