ভূমধ্যসাগরে আবারও ঘটল মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ যাত্রার পথে লিবিয়া উপকূলে অভিবাসীবাহী দুটি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত চারজন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যায় লিবিয়ান রেড ক্রিসেন্ট এই হৃদয়বিদারক খবর নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় আরও বহু অভিবাসীর সলিলসমাধি ঘটেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রবিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১১৮ কিলোমিটার পূর্বে আল-খুমস উপকূলের কাছে দুর্ঘটনা দুটি ঘটে। উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে, এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশিদের বহনকারী নৌকার করুণ পরিণতি লিবিয়ান রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ডুবে যাওয়া প্রথম নৌকাটির সমস্ত আরোহীই ছিলেন বাংলাদেশি। মোট ২৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী নিয়ে নৌকাটি উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছিল। দুর্ঘটনার পর কোস্টগার্ড ও স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থার উদ্ধারকারী দল অভিযান চালিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে নৌকায় থাকা বাকি বাংলাদেশিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। শহরের পাবলিক প্রসিকিউশনের নির্দেশে উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দ্বিতীয় নৌকা ও ৬৯ আরোহীর ভাগ্য অনিশ্চিত একই এলাকায় ডুবে যাওয়া দ্বিতীয় নৌকাটিতে ৬৯ জন অভিবাসী ছিলেন। রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌকার যাত্রীদের মধ্যে মিশরীয় এবং সুদানের নাগরিক ছিলেন। এছাড়া আটজন শিশুও ছিল নৌকাটিতে। তবে এই ৬৯ জন আরোহীর কেউই উদ্ধার হয়েছেন কিনা বা তাদের বর্তমান অবস্থা কী, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তাদের সকলেরই মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা দুর্ঘটনার ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মৃত্যুফাঁদ ভূমধ্যসাগর: থামছে না লাশের মিছিল লিবিয়া উপকূল হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের এই পথটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর অভিবাসন রুট হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে প্রায়শই ঘটছে দুর্ঘটনা।
গত বুধবারও IOM জানিয়েছিল, লিবিয়ার আল বুরি তেলক্ষেত্রের কাছে একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর অন্তত ৪২ জন অভিবাসী নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের সকলেরই মৃত্যু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপোলির পশ্চিম উপকূল থেকে ৬১ জন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে লিবিয়ার উপকূলে ৭৫ জন সুদানী শরণার্থী বহনকারী একটি জাহাজে আগুন লেগে কমপক্ষে ৫০ জনের মৃত্যু হয়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে শত শত মানুষ প্রতিনিয়ত এই মৃত্যুপথে পা বাড়াচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও লিবিয়ার ভূমিকা অভিবাসীদের নিয়ে এই মানবিক বিপর্যয় দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ। গত সপ্তাহে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এক বৈঠকে যুক্তরাজ্য, স্পেন, নরওয়ে এবং সিয়েরা লিওনসহ একাধিক দেশ লিবিয়াকে তাদের দেশে থাকা অভিবাসী ও শরণার্থীদের জন্য নির্মিত আটক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার জন্য কঠোরভাবে আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই কেন্দ্রগুলোতে অভিবাসীদের অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়, যা তাদের জীবন বাজি রেখে সাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করে।